ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

হারিয়ে যাচ্ছে শৈল্পিক ছোঁয়া: কেমন আছেন বিলুপ্তপ্রায় পেশার কারিগররা?

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ৯, ২০২৬, ০১:১৭ পিএম
হারিয়ে যাচ্ছে শৈল্পিক ছোঁয়া। ছবি- সংগৃহীত

সময়ের চাকা ঘুরছে দ্রুত। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর আধুনিকতার জোয়ারে প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে আমাদের যাপিত জীবন। এই পরিবর্তনের মিছিলে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির হাজার বছরের পুরনো অনেক ঐতিহ্য। এক সময় যেসব পেশাকে কেন্দ্র করে গ্রাম-বাংলার অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা আবর্তিত হতো, আজ তারা কেবলই ইতিহাসের অংশ। জাঁকজমকপূর্ণ সেই দিনগুলো পেরিয়ে এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে লিপ্ত কিছু অবশিষ্ট কারিগর।

শাঁখারি বাজারের সেই শঙ্খধ্বনি
এক সময় শাঁখা তৈরি ছিল এক অনন্য শিল্প। হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় শঙ্খ কেটে তৈরি হতো চমৎকার সব অলঙ্কার। পুরনো ঢাকার শাঁখারি বাজারে এখনো সেই ঐতিহ্য টিমটিম করে জ্বলছে। তবে আধুনিক প্লাস্টিক আর মেশিনে তৈরি সস্তা গয়নার ভিড়ে জৌলুস হারিয়েছেন এই কারিগররা। কারিগরদের মতে, এখন আর নতুন প্রজন্ম এই পরিশ্রমী পেশায় আসতে চায় না। ফলে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্পটি এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

নিভে যাচ্ছে কামারশালার আগুন
কোরবানি ঈদ বা চাষাবাদের মৌসুমে এক সময় কামার পাড়ায় দম ফেলার সময় থাকতো না। হাতুড়ি আর নেহাইয়ের ঠকঠক শব্দে মুখরিত থাকতো চারপাশ। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আধুনিক যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা আর লোহার দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক কামার তাদের পেশা পরিবর্তন করছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে পৈতৃক ভিটা ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন শ্রমিকের কাজে।

মৃৎশিল্প: চাকা এখন আর ঘোরে না
মাটির হাড়ি, পাতিল, সানকি আর পুতুল—বাঙালির প্রাণের সাথে মিশে ছিল মৃৎশিল্প। কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম আর প্লাস্টিকের দাপটে মাটির জিনিসের কদর কমেছে। কুমার পাড়ার সেই কর্মব্যস্ততা এখন কেবল বৈশাখী মেলা কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। অনেক পাল বাড়িতে এখন আর চাকা ঘোরে না, রোদ শুকায় না মাটির সরা। নিপুণ কারিগররা আজ অভাবের তাড়নায় এই শৈল্পিক পেশা ছেড়ে দিনমজুরের কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

হারিয়ে যাওয়া পালকি ও বেহারা
এক সময় বিয়ে মানেই ছিল পালকি আর বেহারাদের ‘হুম হুনা’ গান। গ্রামবাংলার মেঠো পথ ধরে নববধূর সেই পালকি যাত্রা আজ শুধুই রূপকথা। যান্ত্রিক যানবাহনের আধিক্যে এই পেশাটি এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত। হাতেগোনা যে ক’জন প্রবীণ বেহারা বেঁচে আছেন, তাদের চোখে কেবলই ফেলে আসা সোনালী দিনের স্মৃতি।

কেন এই বিদায় ঘণ্টা?
গবেষকদের মতে, পেশাগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে:

প্রযুক্তির প্রভাব: হাতের কাজের চেয়ে মেশিনে তৈরি পণ্য দ্রুত এবং সস্তা।

কাঁচামালের অভাব: প্রাকৃতিক কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা ও উচ্চমূল্য।

সামাজিক মর্যাদা: নতুন প্রজন্মের কাছে এই পেশাগুলো এখন আর সম্মানজনক বা লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

একটি পেশা বিলুপ্ত হওয়া মানে কেবল কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হারানো নয়, বরং একটি জাতির সংস্কৃতির একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যদি এই কারিগরদের সঠিক প্রশিক্ষণ এবং বাজারের ব্যবস্থা করা যায়, তবে হয়তো এখনো টিকে থাকা কিছু শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। আমাদের শেকড়কে বাঁচাতে এই কারিগরদের টিকিয়ে রাখা আজ সময়ের দাবি।