মঙ্গলবার ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরের আলো ফোটার আগেই নিভে গেল বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রদীপ্ত শিখা। এ দিন সকাল ৬টায় ফজরের নামাজের পর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া (৮০)। তার মৃত্যুতে কেবল একটি দলের অভিভাবক নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এক দীর্ঘ ও ত্যাগী অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
রাষ্ট্রীয় শোক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্রদ্ধা : বেগম জিয়ার মৃত্যুতে পুরো জাতি আজ স্তব্ধ ও শোকাতুর। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন।
এক শোকবার্তায় ড. ইউনূস বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় খালেদা জিয়ার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
দীর্ঘ সংগ্রাম ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিবৃত্ত : বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল কণ্টকাকীর্ণ কিন্তু অকুতোভয়। ১৯৮১ সালে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলের হাল ধরেছিলেন তিনি। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার আপসহীন ভূমিকা এরশাদ সরকারের পতন ত্বরান্বিত করেছিল।
হাসিনা সরকারের প্রতিহিংসার শিকার : খালেদা জিয়ার জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে লড়াই করে। বিগত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার তার ওপর চালিয়েছে অমানবিক মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন।
মিথ্যা মামলা ও কারাবরণ : সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় তাকে দীর্ঘ সময় কারান্তরীণ রাখা হয়।
চিকিৎসায় বাধা : গুরুতর অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার। পরিবারের বারবার অনুরোধ ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার দাবিকেও কর্ণপাত করেনি হাসিনা প্রশাসন।
গৃহবন্দিত্ব ও একাকিত্ব : এমনকি ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে পর্যন্ত তাকে কার্যত গৃহবন্দি (হসপিটালে) করে রাখা হয়েছিল। এই দীর্ঘ অবহেলা ও সুচিকিৎসার অভাবেই তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে।
আন্তর্জাতিক মহলের শোকবার্তা : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বেগম জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন।
এমনকি নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা ও তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও এই মৃত্যুকে ‘রাজনীতির অপূরণীয় ক্ষতি’ হিসেবে স্বীকার করে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন, যা বেগম জিয়ার রাজনৈতিক উচ্চতাকেই পুনর্বার প্রমাণ করে।
ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর এক নেত্রী : ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর তিনি লন্ডনে উন্নত চিকিৎসা নিয়ে ২০২৫-এর মে মাসে বীরের বেশে দেশে ফিরেছিলেন। সর্বশেষ ২১ নভেম্বর সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে হুইল চেয়ারে বসে দেশবাসীকে একঝলক দেখা দিয়েছিলেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতা তাকে কাবু করলেও তার আত্মিক মনোবল ছিল অটুট।
পারিবারিক জীবনে তিনি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হারিয়েছেন বিদেশের মাটিতে। বর্তমানে তার বড় ছেলে ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মনে রাখবে সেই নেত্রীকে, যিনি ক্ষমতার লোভে নয়, বরং জনগণের অধিকারের প্রশ্নে কখনো মাথা নত করেননি। জেল-জুলুম আর হীনম্মন্যতার রাজনীতির শিকার হয়েও তিনি ছিলেন ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’। আজ তার প্রস্থানে বাংলাদেশ হারিয়েছে তার সবচেয়ে প্রিয় অভিভাবককে।

