২০২৫ সালে দেশে গণপিটুনিতে ১৬৬ জন এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ৮৬ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদনটি তুলে ধরে এমএসএফ।
সংগঠনটি জানায়, গণতান্ত্রিক পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত হওয়া, জবাবদিহির ঘাটতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বছরজুড়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ অব্যাহত ছিল।
এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইন ও অধ্যাদেশের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও আইনি হয়রানির ঘটনাও চলমান ছিল। এমএসএফের দাবি, বহু মানুষকে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, যা নাগরিকদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সক্ষমতা সীমিত করেছে।
এমএসএফের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৯৯টি ঘটনায় মোট ৫ হাজার ৬০৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর মধ্যে ৮৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ৯৭ জন গুলিবিদ্ধ ছিলেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৬৫ জন, আওয়ামী লীগের ৮ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৩ জন সদস্য এবং রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি—এমন ১০ জন সাধারণ নাগরিক রয়েছেন।
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর মনোনয়ন ও প্রচার সংশ্লিষ্ট ২৬টি ঘটনায় ২৫২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হন। এসব ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ২৪৯ জন আহত হন। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ১৬৯টি ঘটনায় নিহত হন ৪৭ জন এবং আহত হন ১৮৭ জন।
সরকার পতন ও জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানসংক্রান্ত ঘটনায় এ বছর ৬৭টি মামলা হয়েছে বলে জানায় এমএসএফ। এসব মামলায় ৭ হাজার ৭৮০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ১১ হাজার ১৭৯ জনকে। এর মধ্যে ২৯টি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম রয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সরকার পতনসংক্রান্ত মামলায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ৩ হাজার ৬৯৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর এসব গ্রেপ্তার হয় বলে উল্লেখ করা হয়।
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যৌথবাহিনীর ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর আওতায় ২২ হাজার ২৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৩১৩ জনকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এমএসএফ জানায়, ২০২৫ সালে বিশেষ পুলিশ অভিযানসহ বিভিন্ন মামলায় সারা দেশে মোট ২ লাখ ১২ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও কিছু মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, তবু উচ্চ ও নিম্ন আদালতে এখনো প্রায় ৪৫ লাখ ২০ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও চলতি বছর অব্যাহত ছিল বলে জানায় সংগঠনটি। ‘ক্রসফায়ার’ বা বন্দুকযুদ্ধের অন্তত ১৯টি ঘটনায় ২২ জন নিহত এবং ১৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত ৮টি যৌথ অভিযানে ১২ জন নিহত হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে এ বছর ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে এমএসএফ। এর মধ্যে ৬টি ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে ২ জন নারী। গ্রেপ্তারের ভয়ে পালানোর সময় ধাওয়ার মুখে ৮ জনের মৃত্যুর ঘটনাকেও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়।
২০২৫ সালে কারাগারে ১১৬ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১২ জন অসুস্থতায় মারা যান। একজন আত্মহত্যা করেন, একজন গণপিটুনির পর মারা যান, একজনের মৃত্যু রহস্যজনক এবং একজন নির্যাতনের ফলে মারা যান। নিহতদের মধ্যে ৪১ জন দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ৭৩ জন বিচারাধীন বন্দি ছিলেন।
চলতি বছর সাংবাদিকদের ওপর চাপও বেড়েছে বলে জানায় এমএসএফ। ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর মধ্যে একজন নিহত হন, ২৯৫ জন হামলার শিকার হন, ১৬৩ জন হুমকি বা অপমানের মুখে পড়েন এবং ১৭০টি আইনি হয়রানির ঘটনা ঘটে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৪৬টি মামলা হয় এবং ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ বছর নারীদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ১৪টি এবং শিশু ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯২৮টি সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৯২টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
সংগঠনটি জানায়, ‘মব ভায়োলেন্স’ বা সংঘবদ্ধ সহিংসতায় গণপিটুনির ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ বছর ৪২৮টি গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৬ জন নিহত এবং ৪৬০ জন আহত হন। পাশাপাশি ৬৪১টি অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ উদ্ধারকে চরম নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপহরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছে এমএসএফ। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা জোরদার, কারাগারে স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা, জবাবদিহিমূলক পুলিশিংয়ের মাধ্যমে গণপিটুনি রোধ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এমএসএফের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, প্রকল্প সমন্বয়ক মোহাম্মদ টিপু সুলতান এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ কর্মকর্তা তানিনা খাতুন উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন