২০২৫ সাল ইতিহাসের পাতায় লেখা হলো তরুণ প্রজন্মের শক্তির এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে। সোশ্যাল মিডিয়ার রিল থেকে শুরু করে রাজপথের ব্যারিকেড—প্রতিটি স্থানে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে ‘জেন জেড’। শুধু লাইক বা কমেন্ট নয়, স্মার্টফোন আর ন্যায়বিচারের সংকল্প ব্যবহার করেই তারা দেখিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ দেওয়া সম্ভব।
জেন জেড বা ‘Generation Z’ হলো সেই প্রজন্ম যারা ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। তারা ডিজিটাল যুগে বড় হওয়ায় ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বড় হয়েছে। মত প্রকাশের নতুন মাধ্যমগুলোতে তাদের সক্রিয়তা অন্য প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি।
এই ঢেউয়ের সূচনা হয় ইন্দোনেশিয়ায়, যেখানে আইনপ্রণেতাদের অস্বাভাবিক উচ্চ ভাতা ঘোষণার প্রতিবাদে ছাত্ররা রাজপথে নামে। আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে জনপ্রিয় মাঙ্গা ওয়ান পিস-এর জলদস্যু পতাকা।
সেপ্টেম্বর মাসে নেপালে আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয়-সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘নেপো-কিড’দের বিলাসী জীবন ফাঁস, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধ এবং শেষে পার্লামেন্টে আগুন। এতে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে, জেন জেড নেতৃত্বে তরুণ প্রজন্মের গণআন্দোলন দেশজুড়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিশালী ব্যবহার এবং ডিজিটাল একতায়নের কারণে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সরকারও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে।
জেন জেডের আন্দোলনের সামনে হার মেনে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায় বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
১. সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিজিটাল পাঠশালা
আগে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল কেবল বিনোদনের মাধ্যম। আজ এটি জেন জেডের প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার। আফগানিস্তানে নারী অধিকার হরণ বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল বিষয় তারা সহজ ভাষায় ভিডিও বা রিলের মাধ্যমে তুলে ধরছে।
শুধু তথ্য ছড়ানোই নয়, তারা সাধারণ মানুষকে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতে শেখাচ্ছে। ছোট থেকে বড় আন্দোলন, স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক ইস্যু—সবকিছুতেই এই প্রজন্ম সক্রিয়।
২. নেপাল ও মাদাগাস্কার: রাজপথের উদাহরণ
২০২৫ সালে নেপালে সরকার সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তরুণরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং কাঠমান্ডুর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সংসদ ভবন। কয়েকদিনের চাপের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
অন্যদিকে, মাদাগাস্কারে বিদ্যুৎ ও পানি সংকটের প্রতিবাদে জেন জেডের ডাকা আন্দোলন দেশটিতে সরকারের পরিবর্তন ঘটায়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইন্টারনেট কেড়ে নেওয়া হলেও তরুণদের থামানো সম্ভব নয়।
৩. ‘নেতাহীন’ আন্দোলনের কৌশল
ইন্দোনেশিয়ার #IndonesiaGelap এবং মরক্কোর Gen Z 212—এই আন্দোলনগুলোর বিশেষত্ব হলো কোনো একক নেতা নেই। ডিসকর্ড, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে তারা বিকেন্দ্রীভূতভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে দিচ্ছে।
জেন জেডের মতে, “যদি নেতা থাকে, তাকে দমন করা সহজ। কিন্তু যখন সবাই নেতা, তখন আন্দোলন দমন করা অসম্ভব।” এই ধারণা তাদের কর্মকৌশলকে গতিশীল ও অভিযোজনযোগ্য করেছে।
৪. গ্লোবাল আইকন: গ্রেটা থেকে মাহনূর
বিশ্বমঞ্চে গ্রেটা থুনবার্গ শুধু জলবায়ুর লড়াই নয়, মানবাধিকার ও ন্যায়ের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। হংকংয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জোশুয়া ওয়াং এবং পাকিস্তানে নারী স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে লড়াই করা মাহনূর ওমের দেখিয়েছেন যে, ভয়কে জয় করাই এই প্রজন্মের মূল শক্তি।
তাদের উপস্থিতি দেখায় যে, জেন জেড শুধুমাত্র স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক ইস্যুতেও প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
৫. তারা কী চায়?
জেন জেড কেবল ক্ষমতায় ওঠার লক্ষ্য রাখে না। তারা প্রশ্ন করে—কী হচ্ছে, কে লাভবান হচ্ছে, সাধারণ মানুষের অধিকার কোথায়? শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালসহ অনেক দেশে তাদের আন্দোলন সরকার পরিবর্তনের ধারা সৃষ্টি করেছে।
২০২৫ সালে এই প্রজন্ম দেখিয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমের শক্তি এবং রাজপথের একতায় যে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব।

