অমর একুশে বইমেলা শুরুর তারিখ নিয়ে বাংলা একাডেমি এবং প্রকাশকদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে। বাংলা একাডেমি আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরুর তারিখ ঘোষণা দিলেও প্রকাশকরা একে ‘আত্মঘাতী’,‘অগণতান্ত্রিক’ ও ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ আখ্যা দিয়ে তা বর্জনের হুমকি দিয়েছেন। এই মুখোমুখি অবস্থানে নির্ধারিত সময়ে সফলভাবে মেলার আয়োজন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বাংলা একাডেমির শহীদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা জানান, সামগ্রিক বাস্তবতার আলোকে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকেই বইমেলা শুরু হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভিন্নমত পোষণকারী প্রকাশকদের বিনীতভাবে অনুরোধ করছি কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও বইমেলায় অংশ নিতে। এপ্রিলে মেলা হলে তীব্র তাপপ্রবাহ ও কালবৈশাখী ঝড়ের ঝুঁকি থাকে। মেলার প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।’ প্রকাশকদের আর্থিক চাপ কমাতে স্টল ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে একাডেমি।
বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা আসার পর বিকেলে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সৃজনশীল প্রকাশকদের একটি বড় অংশ। এতে অংশ নেন অন্যপ্রকাশ, অনন্যা, প্রথমা, কাকলী ও ইউপিএলসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের একতরফাভাবে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬’ শুরুর ঘোষণায় সৃজনশীল প্রকাশকরা গভীর বিস্ময় ও চরম হতাশা প্রকাশ করেন। এই সিদ্ধান্তকে তারা ‘আত্মঘাতী’, ‘অগণতান্ত্রিক’ও ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে মন্তব্য করেন। তড়িঘড়ি করে ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া প্রকাশকদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও জানান তারা।
প্রকাশকদের দাবি, বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ মেলা অনুষ্ঠিত হলে সেটা হবে ভূতুড়ে মেলা ও পাঠকশূন্যতা। ২০ ফেব্রুয়ারি রোজার দিনে বইমেলা শুরু হলে পাঠক ও দর্শনার্থীরা মেলায় আসবেন না’- এটাই ধ্রুব সত্য। পাঠক ও ক্রেতা ছাড়া বইমেলা কেবল একটি ‘নিষ্প্রাণ সরকারি আনুষ্ঠানিকতা’ ছাড়া আর কিছুই হবে না। এ ছাড়া মেলার প্রাণ হলো স্টলকর্মীরা, যাদের অধিকাংশই ছাত্র। সারাদিন রোজা রেখে, ইফতার ও দীর্ঘ তারাবিহ নামাজের পর এই হাজারও শিক্ষার্থীকে দিয়ে স্টলে কাজ করানো কতটা মানবিক? বাংলা একাডেমি কি এই ‘মানবিক অধিকার লঙ্ঘন’-এর দায় নেবে? ২০ ফেব্রুয়ারি এ মেলা অুনষ্ঠিত হলে, এটা হবে আমাদের জন্য নিশ্চিত অর্থনৈতিক আত্মহত্যা। গত দেড় বছরে কাগজ ও উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং বিক্রয় মন্দায় প্রকাশনা শিল্প এমনিতেই ধুঁকছে। এই সময়ে জোর করে একটি ব্যর্থ মেলা চাপিয়ে দিয়ে প্রকাশকদের নিশ্চিত লোকসানের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। নতুন সরকার এসে কী সিদ্ধান্ত নেবে তা এখনো অনিশ্চিত। নতুন সরকারের অধীনে ঈদের পর মেলা হওয়াই যৌক্তিক। প্রকাশকদের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, “একাডেমি ঈদের পর (এপ্রিল মাসে) মেলা আয়োজনে ঝড়-বৃষ্টি ও গরমের অজুহাত দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ‘সম্ভাবনা’র চেয়ে চোখের সামনে দেখা দেওয়া ‘নিশ্চিত মানবিক ও বাণিজ্যিক বিপর্যয়’ অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, “দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই—প্রকাশক ও বাংলা একাডেমি পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং সহযোগী। সে কারণেই আমরা সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টারও শরণাপন্ন হয়েছি। মেলার আয়োজক একাডেমি হলেও মেলার ‘আত্মা’ হলো প্রকাশক ও পাঠক। যেখানে প্রকাশকরা প্রস্তুত নন এবং পাঠকরা আসার সুযোগ পাবেন না, সেখানে মেলা কার জন্য? আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি, ঈদের পরে মেলা হলে যদি ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তবে সেই ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্পূর্ণ দায়ভার আমরা প্রকাশকরাই নেব। কিন্তু জেনেশুনে রোজার মধ্যে মেলা করে যে ‘নিশ্চিত মৃত্যু’ আপনারা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন, তার দায়ভার কে নেবে?”
এদিকে, বাংলা একাডেমি ৫২৭টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দের জন্য নির্বাচন করলেও বড় প্রকাশকরা মেলা পেছানোর দাবিতে অনড় রয়েছেন। ইতোমধ্যে ৩২টি প্যাভিলিয়ন ও ১৫২টি স্টলের স্বনামধন্য প্রকাশকরা লিখিতভাবে ঈদের পর মেলা করার পক্ষে সই দিয়েছেন। তাদের মতে, প্রকাশকদের এই বিশাল অংশকে বাদ দিয়ে মেলা আয়োজন করলে তা ইতিহাসের অন্যতম ‘ব্যর্থ ও কলঙ্কিত আয়োজন’ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রকাশকরা একে ‘একতরফা সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখলেও একাডেমি কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘সেটেলড ইস্যু’ হিসেবে মনে করছেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, “প্রত্যেক জিনিসই (মেলার সব আয়োজন) চলবে এবং সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে সময় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।” বাংলা একাডেমি ও প্রকাশকদের এই মুখোমুখি অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত প্রকাশকরা স্টল বরাদ্দ গ্রহণ করবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস) এবং সাধারণ প্রকাশকদের একটি বড় অংশ মেলা পেছানোর দাবি জানিয়েছিলেন।

