আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সারা দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোট গ্রহণ করা হবে, যেখানে ১২ কোটি ৭২ লাখ ৮১ হাজার ৮০৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এর মাধ্যমে ভোটাররা তাদের জনপ্রতিনিধি বেছে নেবেন, যারা আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। এর পাশাপাশি গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে দেশের সংবিধান সংশোধন এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণেও ভূমিকা রাখবেন। অর্থাৎ, ভোটাররা কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন করছেন না, বরং দেশের ভবিষ্যৎ রূপায়ণেও সরাসরি ভূমিকা রাখবেন।
নিচে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সংক্রান্ত সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে তুলে ধরা হলো—
নির্বাচন ও গণভোটের সময়সূচি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে, চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
সংসদীয় আসন
এবারের নির্বাচনে দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে। শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুজনিত কারণে এই আসনে নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।
ভোটারসংক্রান্ত তথ্য
নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন।
মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন।
তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হবার কারণে ওই আসনের ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার ভোট দিতে পারবেন না।
প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। এতে মোট ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। ধানের শীষ প্রতীকে দলটি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯১ জন প্রার্থী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ১৯৮ জন প্রার্থী। অপর দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ৩২ জন প্রার্থী।
ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা
এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনে সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র স্থাপনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার কারণে ওই আসনে ১২৮টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে না।
জানা যায়, পুরুষদের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৭ এবং মহিলাদের জন্য ১ লাখ ২৯ হাজার ৬০২ কক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট কক্ষের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯।
এ ছাড়া, অস্থায়ী ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা প্রাথমিকভাবে ১৪টি, যেখানে ভোটকক্ষ থাকবে প্রায় ১২ হাজারের মতো। অর্থাৎ একটি ভোটকেন্দ্রে গড়ে ৩ হাজার ভোটার থাকবে।
ভোট দান পদ্ধতি
নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট পেপার আলাদা হলেও ভোট দিয়ে জমা দিতে হবে একই বাক্সে। এ নির্বাচনে গণভোটের জন্য গোলাপি রঙের ব্যালট থাকবে। আর সংসদ নির্বাচনের জন্য আগের মতোই থাকবে সাদা রঙের ব্যালট। সংসদ ও হ্যাঁ/না (গণভোট) ভোট দিতে হবে সিল দিয়ে।
গণভোটের বিষয়
গণভোটে নাগরিকরা দেশের সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোতে সম্মতি বা অসম্মতি জানাবেন। এটি একধরনের সরাসরি গণমত যাচাই, যেখানে আপনার ভোটের মাধ্যমে দেশের নীতি ও ভবিষ্যৎ গঠন হবে। গণভোটে অংশগ্রহণ শুধু দায়িত্ব নয়, এটি একটি সুযোগ—দেশের গঠন ও নীতিতে নিজের অবদান রাখার এক অনন্য সুযোগ।
গণভোটের প্রশ্ন
ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
খ. আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধীদল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদ নিশ্চিত করিতে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
ঘ. জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।
নির্বাচন পরিচালনা ও তদারকি
নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। মাঠপর্যায়ে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা দায়িত্ব পালন করছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী, বিজিবি মোতায়েন থাকবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সহায়তামূলক দায়িত্ব পালন করছে।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সংখ্যা—
- সেনাবাহিনী: ১,০০,০০০ জন
- নৌবাহিনী: ৫,০০০ জন
- বিমানবাহিনী: ৩,৭৩০ জন
- পুলিশ: ১,৪৯,৪৪৩ জন
- আনসার ও ভিডিপি: ৫,৭৬,৩১৪ জন
- বিজিবি: ৩৭,৪৫৩ জন
- কোস্টগার্ড: ৩,৫৮৫ জন
- র্যাব: ৭,৭০০ জন
- ফায়ার সার্ভিস: ১৩,৩৯০ জন
- মোট সদস্য: ৮,৯৭,১১৭ জন (প্রায় ৯ লাখ)
ফল ঘোষণা ও পরবর্তী কার্যক্রম
সাধারণত নির্বাচন সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। তবে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ক্ষেত্রে ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। তাই ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ শুরু হবে সকাল সাড়ে ৭টায় এবং চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচনি কেন্দ্রে যদি সাড়ে চারটার পরও ভোটার উপস্থিত থাকেন, সেই কেন্দ্রের ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে।
এবার দুটি ধরনের ব্যালটে ভোট নেওয়ায় এবং প্রবাসী ও সরকারি কর্মকর্তাদের পোস্টাল ব্যালট থাকায় ফলাফল তৈরিতে সাধারণত বেশি সময় লাগবে। ৩০০ সংসদীয় আসনের সাধারণ নির্বাচন, পোস্টাল ব্যালট ও গণভোটের ফলাফল আলাদাভাবে গণনা করে প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।
ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রতিটি কক্ষে থাকা ব্যালট বাক্স প্রার্থীর এজেন্টদের উপস্থিতিতে লক করা হবে এবং গণনা কক্ষে আনা হবে। গণনা কক্ষে সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট উপস্থিত থাকবেন। সংসদ নির্বাচনের সাদা ব্যালট ও গণভোটের গোলাপি ব্যালট আলাদাভাবে গণনা করা হবে। যদি কোনো ব্যালট সিলমোহরহীন বা স্বাক্ষরবিহীন থাকে, তা বাতিল গণ্য হবে।
গণনা শেষে কেন্দ্রভিত্তিক রেজাল্ট শিট তৈরি করা হয়। এখানে প্রতিটি প্রার্থীর ভোট সংখ্যা, বাতিল ভোট এবং মোট ভোট স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। শিটে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্ট স্বাক্ষর করবেন। ফলাফলের কপি ভোটকেন্দ্রের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো হয় এবং কেন্দ্রের ব্যালট ও সরঞ্জামসহ সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। প্রার্থীর এজেন্ট, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক চাইলে কপি পেতে পারেন।
সব কেন্দ্রের ফলাফল সংগ্রহের পর প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা করেন।



-20260209175600.webp)
সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন