দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬-এর জন্য মোট ২০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করেছে সরকার। এ তালিকায় রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মেহেরিন (মাহরীন) চৌধুরীকেও মরণোত্তরভাবে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। বিমান দুর্ঘটনার সময় তিনি শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে আত্মত্যাগ করেন।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। এবার ১৫ জন ব্যক্তি ও ৫টি প্রতিষ্ঠানকে এই সম্মাননা পদক দেওয়া হবে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজসেবা, জনপ্রশাসন, গবেষণা-প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
২০২৪ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুলের হায়দার আলী ভবনে একটি প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে আগুন লাগলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেই মুহূর্তে নিজের জীবনের কথা না ভেবে দৌড়ে শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে ছুটে যান মেহেরিন চৌধুরী।
শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বের করে আনতে সক্ষম হলেও তিনি নিজে গুরুতরভাবে দগ্ধ হন। পরে তাকে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। শরীরের প্রায় শতভাগ দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি মারা যান।
হাসপাতালে জীবনের শেষ মুহূর্তে স্বামী মনসুর হেলালকে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমারও সন্তান। কীভাবে ওদের ফেলে চলে আসি বলো? আমার কিছু হয়ে গেলেও ওদের তো ওই নরকে ফেলে আসতে পারি না।’ শেষ সময়েও সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের কথাই ভাবছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে স্বামীকে সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখার কথাও বলে যান।
২০০৬ সালে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ২০০৭ সালে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ইংরেজি ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মেহেরিন চৌধুরী। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে পদোন্নতি পান।
শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা, অভিভাবকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতার জন্য তিনি সবার কাছে প্রিয় ছিলেন। অনেক সময় গভীর রাতেও শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের ফোন ধরে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিতেন তিনি।
রাজধানীর শাইনপুকুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর তিতুমীর কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে তিনি স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকার দিয়াবাড়ীতে বসবাস করতেন। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী ও দুই ছেলে রেখে গেছেন। স্বামী মনছুর প্রাইড গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক।
নিজের জীবন উৎসর্গ করে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এই শিক্ষককে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করার সিদ্ধান্তকে অনেকেই জাতির পক্ষ থেকে একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন