সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একবারে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ঘাটতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়েই সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এ অবস্থায় সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। ফলে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি গ্রহণের দিকেই ঝুঁকছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, একবারে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করা হলে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা রয়েছে। এর পরপরই শুরু হবে বাজেট অধিবেশন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সংসদের অধিবেশনে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি পে কমিশনের দেওয়া সুপারিশ ও প্রস্তাব রিভিউ করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এটি ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও পে কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি পিকেএসএফ চেয়ারম্যান হিসেবে সাক্ষাৎ করেন, তবুও বৈঠকে পে কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পে স্কেলের সুপারিশ বাস্তবায়নের আগে তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। তিনি বলেন, “আমাদের দেখতে হবে মোট ব্যয় কত দাঁড়ায় এবং সরকারের পক্ষে কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ট্যাক্স রেভিনিউ ও ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম অবস্থায় রয়েছে। ফলে নতুন কোনো বড় ব্যয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছর ২০২৬-২৭ সামনে রেখে প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কতটা সম্ভব হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব অর্থনীতিতে বাড়ছে।
তবে সরকার চাইছে না যে পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ুক। সে কারণেই প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো পুনরায় পর্যালোচনা বা রিভিউ করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে ২১ সদস্যের একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থ সচিব ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানকে কমিশনের প্রধান করা হয়। কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল এবং চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তারা তাদের সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনে বাজেট প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলে পে কমিশনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ করতে পারে সরকার।




