বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি হওয়া দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন বন্যা, নদীভাঙন, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং খাদ্য ও পানির সংকট দেশের কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্যানেল (আইপিসিসি)-এর প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে দ্রুত হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে। বরফের আচ্ছাদন কমে যাওয়ায় কার্বন নিঃসরণের প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই শতকের শেষে বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে গেলে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানবজীবনে। অনেক গবেষকের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে শতকের শেষে তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর স্বাভাবিক পরিবর্তন থাকলেও বর্তমান উষ্ণায়নের মূল কারণ মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যানবাহন পরিচালনা এবং গৃহস্থালির জ্বালানির জন্য তেল, গ্যাস ও কয়লা পোড়ানোর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। উনবিংশ শতকের তুলনায় বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে গত দুই দশকেই বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। পাশাপাশি বন উজাড়ের ফলে কার্বন শোষণের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, গাছপালা নিধন, পাহাড় কাটা, মাটি উত্তোলন, ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত আহরণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা দেশের উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কপ-২৯ সম্মেলনে উন্নত দেশগুলোর প্রত্যাশিত অঙ্গীকার না আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু অর্থায়নে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের দাবি থাকলেও দীর্ঘ আলোচনার পর বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমালোচকদের মতে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি দায়ী উন্নত ও উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি ও ফ্রান্স—ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছে। এতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো আরও সংকটে পড়ছে।
দেশের অভ্যন্তরেও জলবায়ু তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিল এলেও তার কার্যকর ব্যবহার ও জবাবদিহি নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে উপকূলীয়, নদীভাঙনপ্রবণ ও পার্বত্য এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এসব অর্থ প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।
তাদের মতে, সরকারের নেওয়া অনেক প্রকল্প শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রাম, উপকূল ও পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তব সমস্যার সমাধান হয়নি। ফলে উপকূলীয় এলাকায় ভাঙন, লবণাক্ততা, খাদ্য ও পানির সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ নিজেদের উদ্যোগেই অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা না থাকায় তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে না।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করে জনগণকেন্দ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ, জলবায়ু তহবিলের স্বচ্ছ ব্যবহার, পরিকল্পিত নগরায়ণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনভিত্তিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের জলবায়ু আন্দোলন ও পরিবেশ সংরক্ষণে আরও সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রতিকারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন এবং কার্যকর পরিবীক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জনজীবনের জন্য আরও বড় সংকট হয়ে উঠতে পারে।

