সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক কালবেলার জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক শেখ হারুনকে মুঠোফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রায়হান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযুক্ত রায়হান নিজেকে ক্যাপ্টেন পরিচয় দিয়ে ঐ সাংবাদিককে হুমকি দেন। সিগারেট উৎপাদনকারী কোম্পানি ভার্গো টোব্যাকো ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য নিতে গিয়ে প্রথমে ‘নিউজ না করার’ অনুরোধ এবং পরে হুমকির মুখে পড়েন কালবেলা প্রতিবেদক শেখ হারুন। রাজস্ব ফাঁকি, অনিয়ম এবং জাল-জালিয়াতির তথ্য নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে এই সংবাদকর্মীকে ভয়ভীদতি ও দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) রাত ৯টার সময় এই সংবাদকর্মীকের মুঠোফোনে ভয়ভীতি ও দেখে নেওয়ার হুমকি দেন নিজেকে ক্যাপ্টেন পরিচয়ে দেওয়া ওই ব্যাক্তি।
ক্যাপ্টেন পরিচয়ে হুমকি দাতা অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির নাম মো. রায়হানুল ইসলাম। তিনি একসময় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন। বছর দুয়েক আগে অবসরে যান।
জানা গেছে,সোমবার (১৬ মার্চ) কালবেলা পত্রিকায় ভার্গো টোব্যাকোর অনিয়ম নিয়ে ‘ধুরন্ধর ভার্গো টোব্যাকো’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে তথ্য গোপন করে অবৈধভাবে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি করছে ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেড। রাজস্ব ফাঁকি দিতে অপ্রদর্শিত তামাক ব্যবহার করে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি। গত সাত মাসে তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে ৩৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে কোম্পানিটি। বিশেষ অভিযানে পাওয়া তথ্য ও এনবিআরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনের (ঢাকা উত্তর) তদন্তে ভার্গো টোব্যাকোর কর ফাঁকির জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। তথ্য গোপন করে উৎপাদন ও বিক্রি করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি কর ফাঁকির মামলা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ওই মামলার সূত্র ধরে সংবাদ প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছিলেন শেখ হারুন।
প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু করার পর থেকেই কালবেলা প্রতিবেদককে রায়হান নামের ওই ব্যাক্তি ভার্গো কোম্পানির মালিক পক্ষের কাছের লোক বলে প্রথমে নিউজ না করার পরামর্শ ও পরে হুমকি দেন। সবশেষ শনিবার (১৪ মার্চ) রাত ৯টার সময় রায়হান নামের ওই ব্যাক্তি কালবেলা প্রতিবেদককে ফোন এবং ভয়েস মেসেজ দিয়ে হুমকি দেন। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কোম্পানি ভার্গোর ডিএমডি অমল হালদারের বক্তব্য নেওয়ায় কালবেলা প্রতিবেদককের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার পাশাপাশি হুমকি দেওয়া হয়।
কালবেলা সূত্রে জানা গেছে, অমল হালদারের বক্তব্য নেওয়ার পরপরই রায়হান নামের ওই ব্যক্তি ফোন দিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি প্রতিবেদকের কাছে কৈফিয়ত চেয়ে প্রশ্ন করতে থাকেন! প্রতিবেদক তার প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করে ডিএমডিকে ফোন দিয়ে বক্তব্য নিয়েছেন জানালে তিনি উত্তেজিত হয়ে ফের প্রশ্ন করেন—‘আপনি কেন অমল সাহেবকে ফোন দিয়েছিলেন? আপনি কি কাস্টমস কমিশনার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ? আপনাকে কে অথরাইজ করেছে?’
রায়হান বলেন, ‘আপনি তো ফোন দেওয়ার অথরিটি না। আপনি তো পুলিশ না, আপনি কাস্টমসেরও কেউ না। আপনি কেন ফোন দেবেন উনাকে? আপনার কথা বলতে হলে তো গাজীপুরের কমিশনারের, কাস্টমসের অনুমতি নিতে হবে। পারমিশন ছাড়া আপনি কেন ফোন দিয়েছেন? এজন্য র্যাব-পুলিশ দিয়ে আপনাকে ফোন দেওয়াবো।’ফোনালাপের শেষ দিকে তিনি প্রতিবেদককে ভবিষ্যতে কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করতে বলেন এবং আবার যোগাযোগ করলে ‘ব্যক্তিগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলেও হুমকি দেন। এতেই তিনি ক্ষান্ত হননি। কিছুক্ষণ পর কালবেলা প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে দুটি ভয়েস মেসেজে পাঠান রায়হান নামের ওই ব্যক্তি।
ভয়েস মেসেজের শুরুতে তিনি বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে আর বিরক্ত করবেন না। কেউ যদি আপনাকে উসকানি দিয়ে এসব করাতে চায়, তাকে পরিষ্কার বলে দেবেন এখানে অনেক উচ্চ পর্যায়ের লোকজন আছে। আমার পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড যদি না জানেন, আপনি এসে খোঁজ নিয়ে জেনে যাবেন। না হলে আমি রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে বিষয়টি ডিল করব।’
প্রতিবেদকের উদ্দেশ্য তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি চাই না যে, আমাকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে হয়; কিন্তু যদি আমাকে বিষয়টা পার্সোনালি ডিল করতে হয়, সেটার আপনার জন্য ভালো হবে না, আপনার অবস্থা খুবই খারাপ হবে। নেক্সট টাইম আমি আপনার সঙ্গে ফোনে কোনো কথা বলব না। আপনি এবং আপনার ফ্যামিলি সুন্দর এবং শান্তিমতো থাকেন, আমাকে উত্তেজিত করবেন না।’
হুমকির ঘটনায় নিজের নিরাপত্তা বিবেচনা ঢাকা নিউমার্কেট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন সংবাদকর্মী শেখ হারুন। যার জিডি নাম্বার ৯৫৭।
ঘটনাটির বিষয়ে কালবেলা প্রতিবেদক শেখ হারুন বলেন, ভার্গো কোম্পানির বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি জানান পর বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকি। একপর্যায়ে জানতে পারি তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এবিষয়ে ভার্গো কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার জন্য কোম্পানিটির বিষয়ে খোঁজ খবর নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া ই-মেইলে মেইল করেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে রায়হান নামের ওই ব্যাক্তি আমাকে প্রথমে নিউজ না করার পরামর্শ ও পরে আমাকে ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি হুমকি দেন।
তিনি বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে এবং সে বিষয়ে মামলা হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়। তাই পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকে সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করে অন্যান্য নিউজের মতোই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অভিযুক্তের বক্তব্য নিতে গিয়ে এমন হুমকির সম্মুখীন হতে হবে এটা কখনো ভাবিনি। এ কারণে নিউমার্কেট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছি।
নিউমার্কেট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহম্মদ আইয়ুব জানান, কালবেলার সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। ইতোমধ্যে সাধরণ ডায়েরি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, ক্যাপ্টেন পরিচয়ে হুমকি দাতা অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন রায়হানুল ইসলামের স্থায়ী ঠিকানা ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়া উপজেলার কালমেঘে। বর্তমান ঠিকানা—কে.ডি ঘোষ রোড, রংপুর সদর, রংপুর। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ২৮ বছর ৮ মাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ভার্গো টোব্যাকোর মালিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলামের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং বর্তমানে তিনি শাফায়েতুল ইসলামের বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করেন।


