ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডই দায়ী : বিজ্ঞানীরা

মো. সায়েম ফারুকী
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ইস্যু। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই এখন এই সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। একই সঙ্গে জলবায়ু সংকটকে ‘ক্লাইমেট ইমার্জেন্সি’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবিও দিন দিন জোরালো হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত নয়; এটি মানবসভ্যতা, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি।

জলবায়ু পরিবর্তন বলতে পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়াগত পরিবর্তনকে বোঝায়। এ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি। জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস সূর্যের তাপ বায়ুমণ্ডলে আটকে রেখে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, তবে এর প্রভাব হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি আরও তীব্র হয়ে উঠবে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গত চার দশক ধরে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এসব গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জেনেভা কনভেনশন, কিয়োটো প্রটোকল এবং প্যারিস চুক্তিসহ বিভিন্ন জলবায়ু সম্মেলনে এই সংকটকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব চুক্তির মূল লক্ষ্য হচ্ছে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে আনা।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মত, বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মূলত মানুষের কর্মকাণ্ডই দায়ী।

শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশ দূষণের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও অল্পসংখ্যক গবেষক জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রের অংশ হিসেবে দেখেন, তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার বড় অংশই মানবসৃষ্ট কারণের পক্ষে শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিটওয়েভ, পানিশূন্যতা, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন বাহকবাহিত রোগের বিস্তার, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, হারিকেন, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগের সংখ্যা বাড়ছে।

এর পাশাপাশি নিরাপদ পানীয় জলের সংকট, কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও পড়ছে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব। এসব কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ক্লাইমেট ইমার্জেন্সি’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। নীতিনির্ধারণে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি, নিরাপদ পানীয় জল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই অভিযোজন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।