অস্ট্রেলিয়া-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠান এয়ারট্রাঙ্ক (AirTrunk) ভারতে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩ লাখ কোটি রুপি অথবা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রবিন খুদা এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, এয়ারট্রাঙ্কের এই বিনিয়োগ ভারতের ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে প্রস্তাবিত অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে দেশে ৫ গিগাওয়াট ডেটা সেন্টার সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে।
তিনি আরও বলেন, এই বিনিয়োগ ভারতকে ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের বিকাশ এবং উদ্ভাবনভিত্তিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
রবিন খুদা বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বার্তা পেয়েছি যে ভারত বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত এবং দেশটি পরবর্তী প্রজন্মের এআই ও ক্লাউড অবকাঠামো গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই অবকাঠামো আগামী প্রজন্মের জন্য ভারতের শিল্প ও অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করবে।’
প্রধানমন্ত্রী মোদীর পাশাপাশি তিনি মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্রপ্রদেশের মন্ত্রীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
কে এই রবিন খুদা?
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রবিন খুদা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সফল প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। তিনি এয়ারট্রাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তিনি খুদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জনহিতকর কর্মকাণ্ডের জন্যও পরিচিত।
রবিন খুদার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তার বাবা এস. এম. ওয়াজেদ আলী। তিনি শের-ই-বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে মিরপুরের এসওএস হারম্যান গ্মেইনার কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
১৯৯৭ সালে এইচএসসি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। সিডনি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন খণ্ডকালীন চাকরি করেছেন রবিন। পরে তিনি একজন সার্টিফায়েড প্র্যাকটিসিং অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন।
করপোরেট জীবন থেকে উদ্যোক্তা
২০০৭ সালে তিনি জাপানি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ফুজিৎসুতে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে টেলিযোগাযোগ ও ক্লাউড কম্পিউটিং কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করেন।
পরবর্তীতে তিনি পাইপ নেটওয়ার্কসের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে কাজ করেন। সেখানে অস্ট্রেলিয়া ও গুয়ামের মধ্যে সাবমেরিন ফাইবার-অপটিক কেবল নির্মাণ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এরপর নেক্সটডিসি (NextDC)-তে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তার নেতৃত্বে কোম্পানিটির বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারে উন্নীত হয়।
২০১৪ সালে তিনি নেক্সটডিসি ছেড়ে টেলিযোগাযোগভিত্তিক পেমেন্ট কোম্পানি মিন্ট ওয়্যারলেসের সিইও হন।
এয়ারট্রাঙ্কের জন্ম
করপোরেট জীবনে কাজ করার সময় রবিন খুদা উপলব্ধি করেন যে ভবিষ্যৎ হবে ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা অবকাঠামোর। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও ফেসবুকের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণ তাকে নতুন সুযোগের সন্ধান দেয়।
এই উপলব্ধি থেকেই ২০১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এয়ারট্রাঙ্ক। লক্ষ্য ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃহৎ আকারের, সাশ্রয়ী এবং শক্তি-সাশ্রয়ী হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা।
তবে শুরুর পথ মোটেও সহজ ছিল না। তহবিল সংগ্রহে নানা বাধার মুখে পড়েন তিনি। নিজের ব্যক্তিগত সঞ্চয়, পেনশন তহবিল এবং সম্পদের বড় অংশ বিনিয়োগ করেন নতুন প্রতিষ্ঠানে। একসময় তিনি প্রায় দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতেও পড়েছিলেন।
অবশেষে ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হন। এরপর দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু করে এয়ারট্রাঙ্ক।
বর্তমানে এয়ারট্রাঙ্ক অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ডেটা সেন্টার পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির ১১টি বড় ডেটা সেন্টার রয়েছে এবং আরও কয়েক ডজন নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেটা ব্যবস্থাপনা ও স্টোরেজ খাতে এয়ারট্রাঙ্ক এখন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।
ঐতিহাসিক অধিগ্রহণ
২০২৪ সালের শেষ দিকে বিশ্বের বৃহত্তম বিকল্প সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোনের নেতৃত্বে এবং সিপিপি ইনভেস্টমেন্টসের অংশগ্রহণে একটি কনসোর্টিয়াম এয়ারট্রাঙ্ক অধিগ্রহণ করে।
এই চুক্তির মূল্য ছিল প্রায় ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার, যা ডেটা সেন্টার খাতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম অধিগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অধিগ্রহণের পরও রবিন খুদা প্রতিষ্ঠানটির সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং মালিকানার অংশ ধরে রেখেছেন। এই চুক্তির ফলে তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে যায়।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
ব্যবসায়িক নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রবিন খুদা ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউর ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার’ সম্মাননা লাভ করেন। ২০২৫ সালে তিনি ‘সিডনিসাইডার অব দ্য ইয়ার’ খেতাবেও ভূষিত হন।
বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনীদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন।
ঢাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্ব প্রযুক্তি খাতের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তায় পরিণত হওয়ার গল্পটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায়, দূরদর্শিতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
রবিন খুদা প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন যদি বড় হয় এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস থাকে, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সফলতার শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য তিনি আজ এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম।

