ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

কম্বোডিয়ায় চাকরির প্রলোভনে নারী পাচার, চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তার

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে কম্বোডিয়ায় পাচার, পাসপোর্ট ও অর্থ জোরপূর্বক নিয়ে নেওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগে একটি মানবপাচার চক্রের মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) ইউনিট মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. রুবেল (২৯) নামে ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তিনি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার খাগজানা গ্রামের বাসিন্দা।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আর্থিক সংকটে থাকা ভুক্তভোগী নারী স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সেই এনজিওতে কর্মরত রুবেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে রুবেল তাকে কম্বোডিয়ায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব দেন।

ভুক্তভোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় রুবেল তাকে এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিতে উৎসাহিত করেন। ঋণের অর্থ হাতে পাওয়ার পর তা নিজের কাছে নিয়ে নেন এবং ভুক্তভোগীর পাসপোর্টও সংগ্রহ করেন। পরে বিদেশে পাঠানোর নামে বিভিন্ন সময়ে আরও টাকা নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ধারদেনা করে অভিযুক্তের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে দুই লাখ টাকা পাঠান। সব মিলিয়ে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে মোট চার লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ভিসা ও বিমানের টিকিট দিয়ে ওই নারীকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর চক্রের সদস্যরা তার পাসপোর্ট ও সঙ্গে থাকা অর্থ জোর করে নিয়ে নেয়। এরপর তাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে অনিচ্ছাকৃত কাজ করানো হয় এবং তার উপার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

এছাড়া তাকে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি দেশে ফিরতে চাইলে প্রাণনাশ এবং অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্যাতন থেকে বাঁচতে একপর্যায়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করেন ভুক্তভোগী। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও মানবিক সংস্থার সহায়তায় গত ১ জুলাই তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পরে আইনগত সহায়তা নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

সিআইডি জানায়, ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্তে অভিযান চালানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় মামলার প্রধান অভিযুক্ত রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালতের আদেশে তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মানবপাচার চক্রের অন্যান্য সদস্য, আর্থিক লেনদেন, বিদেশে অবস্থানরত সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে। একই চক্রের মাধ্যমে আরও কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে পাচার বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত চলছে।

এদিকে সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হয়ে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা, মানবপাচার, জিম্মি বা নির্যাতনের কোনো তথ্য জানা থাকলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সিআইডিকে অবহিত করার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।