ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

দাম ধসে বিপাকে জিআই স্বীকৃত রাজশাহীর মিষ্টি পান, সংকটে পান শিল্প

রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও ব্যাপক চাহিদা ছিল জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃত রাজশাহীর সুমিষ্টি পানের। কিন্তু রপ্তানি কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা হ্রাস এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন সেই পানের দাম তলানিতে। ন্যায্য মূল্য না পেয়ে লোকসানে পড়ছেন পানচাষিরা। একই সঙ্গে কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বরজের শ্রমিকরা। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জিআই স্বীকৃত রাজশাহীর সুমিষ্টি পান দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী কৃষিপণ্য। স্বাদ, গন্ধ ও মানের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশের বাজারেও এর সুনাম রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে দরপতন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সংকুচিত হওয়ায় এই শিল্পে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা।

রাজশাহীর বাগমারা, মোহনপুর, দুর্গাপুর, পবা ও আশপাশের এলাকায় সবচেয়ে বেশি মিষ্টি পানের চাষ হয়। এসব এলাকার হাজারো কৃষক ও শ্রমিক সরাসরি পানচাষের সঙ্গে জড়িত। উৎপাদিত পান বাগমারার মচমইল, তাহেরপুর, মোহনগঞ্জ, মাদারীগঞ্জ, কুমারীতলা, একডালা, দুর্গাপুরের দাওকান্দি, কালিগঞ্জ, কানপাড়া, আলীপুর, শ্যামপুর, গোপালপুর, দুর্গাপুর সদর, মোহনপুরের মৌগাছি, একদিলতলা, কেশরহাট, ধোপাঘাটা, ধুরসা, কুঠিবাড়ি, পাকুড়িয়াসহ বিভিন্ন হাট ও আড়তের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো ক্রেতার উপস্থিতি নেই। পানের গাদির পর গাদি বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। ফলে কৃষকদের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট।

চাষিদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এক গাদি পান ১০ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হতো। বর্তমানে একই পরিমাণ পান বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকায়। আবার এক পোয়া বড় পান, যা আগে প্রায় পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রে ৫০০ টাকাও মিলছে না।

অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েই চলেছে। বরজের খুঁটি, ছাউনি, বাঁশ, দড়ি, বেত, বিভিন্ন উপকরণ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের দাম না বাড়ায় লোকসানের বোঝা টানতে হচ্ছে কৃষকদের।

এর প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। পান বরজে নিয়মিত কাজ করা বহু শ্রমিক এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কাজ না থাকায় অনেকেই অন্য পেশায় ঝুঁকছেন, আবার কেউ কেউ বেকার সময় কাটাচ্ছেন। এতে তাদের পরিবার চালানোও কঠিন হয়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজশাহীর মিষ্টি পান রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশেও রপ্তানি হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও রপ্তানি কমে যাওয়ায় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

দুর্গাপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামের পানচাষি সাঈদ ইসলাম বলেন, "এক সময় রাজশাহীর মিষ্টি পানের ব্যাপক কদর ছিল। ভালো দাম পাওয়া যেত। এখন সেই বাজার নেই। দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক পানের বরজ তুলে অন্য ফসলের চাষ শুরু করেছেন।"

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, জিআই স্বীকৃত এই কৃষিপণ্য টিকিয়ে রাখতে হলে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পানের চাষ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা দেওয়া হলে জিআই স্বীকৃত রাজশাহীর মিষ্টি পান শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।