ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

রাষ্ট্রপতির বেতন কত? কী কী সুবিধা পান?

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের আনুষ্ঠানিক প্রধান। তিনি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক (কমান্ডার ইন চিফ)। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দণ্ডাদেশ স্থগিত, হ্রাস বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার ক্ষমতাও রয়েছে।

বর্তমানে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেন। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। অনেক সময় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়া প্রতি বছরের প্রথম সংসদীয় অধিবেশনেও তিনি ভাষণ দেন। রাষ্ট্রপতির এই ভাষণে সাধারণত সরকারের নীতি ও কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া প্রতিটি বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আইনে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রপতির বেতন কত?

সর্বশেষ ২০১৬ সালের সংশোধিত আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। রাষ্ট্রপতির বেতন সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত। এ ছাড়া তিনি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা ছুটি ভাতা পান, যা করমুক্ত।

১৯৭৫ সালে প্রণীত ‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) আইন’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ১৯৭৫ সালের ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে আইনটি পাস হয়। এরপর আইনটি একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে।

আইন প্রণয়নের সময় ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির বেতন ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা। পরে বিভিন্ন সময়ে তা বাড়ানো হয়। ১৯৮৭ সালে ১০ হাজার টাকা, ১৯৯২ সালে ১৫ হাজার টাকা, ১৯৯৮ সালে ২৩ হাজার টাকা, ২০০৫ সালে ৩৩ হাজার ৪০০ টাকা, ২০০৯ সালে ৬১ হাজার ২০০ টাকা এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

যেসব সুবিধা পান রাষ্ট্রপতি

আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের আবাসন, খাবার, চিকিৎসা, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন সেবা খাতের ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়।

রাষ্ট্রপতির সরকারি আবাসন সাধারণত বঙ্গভবনে হলেও তিনি অন্য কোনো বাসভবনে থাকলে সেটির প্রয়োজনীয় সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ব্যয়ও সরকার বহন করে। রাষ্ট্রপতির বাসভবনসংলগ্ন রাস্তা মেরামত ও সংস্কারের খরচও সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের খাবারের খরচও সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এ ক্ষেত্রে বাবুর্চি ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ব্যয়ও সরকার বহন করে। আইনে পরিবারের সদস্য বলতে রাষ্ট্রপতির স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, পিতা-মাতা এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল অবিবাহিত ভাই-বোনকে বোঝানো হয়েছে।

যানবাহন ও ভ্রমণ সুবিধা

রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহনের ব্যবস্থা সরকার করে। রাষ্ট্রপতির দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে সফরের সব ধরনের ব্যয়ও সরকার বহন করে।

পরিবহনের জ্বালানি খরচ সরকার বহন করে এবং এ ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধা রয়েছে। রাষ্ট্রপতি রেল, বিমান ও নৌযানে ভ্রমণের সময় সর্বোচ্চ সুবিধাসম্পন্ন আসন ব্যবহারের সুযোগ পান। বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার তার জন্য বছরে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিমা সুবিধা প্রদান করে।

চিকিৎসা ও আপ্যায়ন সুবিধা

রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের আবাসস্থলে সাধারণ চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে। এ ছাড়া দেশের সরকারি খরচে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশেও চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন।

বঙ্গভবনে দেশি-বিদেশি অতিথি, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজনের আপ্যায়ন ব্যয়ও সরকারি নির্ধারিত খাত থেকে বহন করা হয়। এর মধ্যে ইফতার, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, বুদ্ধপূর্ণিমা, দুর্গাপূজা, বড়দিন, পয়লা বৈশাখ ও শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি কোনো দেশি-বিদেশি অতিথিকে আপ্যায়ন করলে বা উপহার দিলে তার ব্যয়ও সরকারি খাত থেকে বহন করা হয়।

করমুক্ত পণ্য ও অন্যান্য সুবিধা

আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, তার পরিবারের সদস্য, কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অতিথিরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে করমুক্তভাবে বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করতে পারেন। এর মধ্যে পানীয় ও তামাকজাত পণ্যও রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যয় সরকারি তহবিল থেকে পান।

স্বেচ্ছাধীন তহবিল

রাষ্ট্রপতি বছরে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত স্বেচ্ছাধীন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পান। সরকারের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী এই অর্থ ব্যয় করা হয়। সাধারণত দরিদ্র, অসচ্ছল, অসহায় মানুষ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তায় এই তহবিল ব্যবহার করা হয়।

আইন অনুযায়ী এই তহবিলের ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারি অডিটের বিধান নেই।

অবসরকালীন সুবিধা

রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনের পর অবসরে গেলেও আইন অনুযায়ী বিশেষ সুবিধা পান। ছয় মাস বা তার বেশি সময় দায়িত্ব পালন করলে তিনি বেতনের ৭৫ শতাংশ হারে মাসিক অবসর ভাতা পাওয়ার অধিকারী হন।

এ ছাড়া অবসরকালেও একজন ব্যক্তিগত সহকারী, একজন অ্যাটেনডেন্ট এবং সরকার নির্ধারিত দাপ্তরিক খরচের সুবিধা পান। পাশাপাশি মন্ত্রীর সমপরিমাণ চিকিৎসা সুবিধাও পাওয়ার বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত বিষয়গুলো সংবিধান এবং ‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) আইন’-এ নির্ধারিত রয়েছে।