সাতষট্টি বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী অবসরে যাচ্ছেন দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। আগামী ২৭ ডিসেম্বর তার কর্মজীবনের শেষ দিন। এর আগে গতকাল ১৪ ডিসেম্বর তিনি বিদায়ী অভিভাষণ দেন। তবে ২৭ ডিসেম্বর অবকাশকালীন ছুটি থাকায় তার বিচারিক জীবনের কার্যত ইতি ঘটবে ১৮ ডিসেম্বর। এ অবস্থায় দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি কে হচ্ছেন- তা নিয়ে বিচারাঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা।
দেশের তিন অঙ্গের এক অঙ্গ বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি হলেন প্রধান বিচারপতি। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন। সাধারণত আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বর্তমান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি থাকা অবস্থায় গত বছরের ১০ আগস্ট এই পদে নিয়োগ পান- যা একটি ব্যতিক্রমী নজির।
বর্তমানে আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
সংবিধানে কী আছে?
বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করিয়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারকদের নিয়োগ প্রদান করিবেন।
বিচারকদের পদের মেয়াদ সম্পর্কে সংবিধানের ৯৬ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অন্যান্য বিধানাবলি সাপেক্ষে কোনো বিচারক সাতষট্টি বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন।
সংবিধান সংস্কার কমিশন
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্য থেকে মেয়াদের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতম বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের কর্মে প্রবীণতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেবেন।
যাদের নাম এগিয়ে আছে নতুন প্রধান বিচারপতি হওয়ার তালিকায়...
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৫ জুলাই ১৯৫৯ সালে। তার পিতা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম নূরুল ইসলাম এবং মাতা একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর ভারত থেকে এফআইসিপিএস সম্পন্ন করেন। ১৯৮৩ সালে জেলা আদালতে এবং ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। তার স্বাভাবিক অবসর হবে ১৪ জুলাই ২০২৬।
তিনি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, চীন, ফ্রান্স, ইতালি, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, কাজাখ রিপাবলিক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানসহ বহু দেশে রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক সফর করেছেন।
তিনি একাধিকবার প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আপিল বিভাগের চেম্বারকোর্টের বিচারপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ রায়ের মধ্যে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেড প্রদান, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পদমর্যাদাক্রম (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) এবং ২০০৫ সালে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের নির্দেশ।
প্রধান বিচারপতি হলে তার সম্ভাব্য দায়িত্বকাল হবে প্রায় সাড়ে ছয় মাস।
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৮ মে ১৯৬১ সালে। তার পিতা প্রয়াত এএফএম আব্দুর রহমান চৌধুরী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর যুক্তরাজ্য থেকে আন্তর্জাতিক আইনে মাস্টার্স ডিগ্রি গ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৮৫ সালে জেলা আদালতে এবং ১৯৮৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং দুই বছর পর স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। তার উল্লেখযোগ্য রায়ের মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা, নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার অধিকার, ১৫০ দিনের বেশি ওএসডি রাখা অবৈধ ঘোষণা, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা।
তিনি আপিল বিভাগের চেম্বারকোর্টে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার স্বাভাবিক অবসর ১৭ মে ২০২৮, ফলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে।
বিচারপতি মো. রেজাউল হক
বিচারপতি মো. রেজাউল হক জন্মগ্রহণ করেন ২৪ এপ্রিল ১৯৬০ সালে। তিনি এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৮ সালে জেলা আদালতে এবং ১৯৯০ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
২০০৪ সালের ২৩ আগস্ট তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং ২০০৬ সালের ২ আগস্ট স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।
তার গুরুত্বপূর্ণ রায়ের মধ্যে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, ক্ষমতাচ্যুত নেতাকর্মীদের জামিন স্থগিতকরণ, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল আদেশ এবং ধর্ষণ মামলায় প্রমাণভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ আদেশ। তার স্বাভাবিক অবসর হবে ২৩ এপ্রিল ২০২৭।
বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক
বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৯০ সালে জেলা আদালতে এবং ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তিনি ২০০৪ সালের ২৩ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং দুই বছর পর স্থায়ী বিচারপতি হন। পরে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। তার স্বাভাবিক অবসর ৬ নভেম্বর ২০৩০।
বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান
বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৩ সালে জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরে ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট এবং ২০০১ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তিনি ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং দুই বছর পর স্থায়ী বিচারপতি হন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। তার অবসর ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৯২ সালে জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরে ১৯৯৪ সালে হাইকোর্ট এবং ২০০২ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তিনি ২০০৪ সালের ২৩ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং দুই বছর পর স্থায়ী বিচারপতি হন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। তার স্বাভাবিক অবসর ২৬ মে ২০৩৩।
কেন এই নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ?
এইবারের প্রধান বিচারপতির মেয়াদকালে অনুষ্ঠিত হতে পারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পাশাপাশি সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হলে তিনি পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করতে পারেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের যেকোনো বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। তবে অনিশ্চয়তা থাকলেও বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম এবং বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী—এই দুজনকেই সর্বাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

