চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সরকারের শপথের মধ্য দিয়ে তার মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। আঠারো মাস দায়িত্ব পালন করা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা এখন কে কোথায় আছেন এবং কী করছেন—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, দায়িত্ব হস্তান্তরের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস গ্রামীণ টেলিকম ভবনে অবস্থিত ইউনূস সেন্টার–এ নিজের কাজে ফিরে গেছেন। নোবেলজয়ী এই অধ্যাপক সামাজিক ব্যবসার ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সেন্টারটিকে আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাংক ও রিসোর্স হাব হিসেবে পরিচালনা করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি–তে অধ্যাপনা করে আসছেন এবং সেখানেই অবস্থান করতেন। অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি জাতীয় সংস্কার কমিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন। জানা গেছে, নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর তিনি আবারও তার পূর্বের কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে একাডেমিক কার্যক্রমে যোগ দেবেন।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত ব্যক্তিদের একজন ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। দায়িত্বের মেয়াদ শেষে তিনি নতুন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি ওয়াদা–এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ফলে সরকারি দায়িত্ব থেকে সরে এসে তিনি এখন গণমাধ্যমের মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের উপ-প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালন শেষে সাংবাদিকতায় ফিরেছেন আজাদ মজুমদার। ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’-তে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেছেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি ও টেলিযোগাযোগবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) জার্মানিতে চলে গেছেন। দেশের জন্য কাজ করতে এসে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন তিনি। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি দ্রুত নতুন চাকরির সন্ধান করবেন বলে জানিয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে তার অবস্থান ও কর্মজীবন নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের পুরোটা সময় নানা কারণে আলোচিত ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। দায়িত্ব পালন শেষে দেশেই অবস্থান করছেন তিনি। দেশের জন্য কাজ করতে এসে দীর্ঘ সময় পরিবারকে সময় দিতে পারেননি। ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তেমন কিছু জানাননি তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দায়িত্বে ছিলেন তৌহিদ হোসেন। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে তার অবস্থান ও কর্মজীবন নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন শেখ বশিরউদ্দীন। দায়িত্ব পালন শেষে নিজের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেকে পুনরায় সম্পৃক্ত করেছেন তিনি।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী হিসেবে পুনরায় যোগদান করেছেন তিনি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে আলোচিতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেছেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন শারমিন মুরশিদ। দায়িত্ব পালন শেষে তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। তবে তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। নৌপরিবহন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এম.সাখাওয়াত হোসেন। দায়িত্ব পালন শেষে তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। তবে তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ড. খলিলুর রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। গঠন করেছে ৫৯ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিপরিষদও। বিশিষ্ট কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ ড. খলিলুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন আল্লামা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। দায়িত্ব পালন শেষে তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। তবে তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন নাহিদ ইসলাম। গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। বর্তমানে তিনি ঢাকা-১১ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করার পর তার স্থলে দায়িত্বে আসেন মাহফুজ আলম। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর তিনি তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছেন। কিন্তু কোন কাজে যোগদান করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছেন। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন ফরিদা আখতার। দায়িত্ব পালন শেষে তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। তবে তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে তিনি রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছেন। তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কিছু জানা যায় নি।
শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন চৌধুরী রফিকুল আবরার। তার বর্তমান অবস্থান ও কর্মজীবন নিয়ে কিছু জানা যায় নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত (উপদেষ্টার সমতুল্য পদমর্যাদা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন লুৎফে সিদ্দিকী। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে সিঙ্গাপুরের উদেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কিছু জানা যায় নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। দায়িত্ব পালন শেষে তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। তবে তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
এছাড়া নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ সুফিউর রহমান, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায়ের অবস্থান ও বর্তমান কর্মজীবন নিয়েও কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।




সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন