বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে প্রধানতম আনন্দ উৎসব হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। সিয়াম সাধনার পর এ ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি আমাদের জাতীয় সংহতি ও সাম্যের এক মিলনমেলা। তবে প্রতি বছর ঈদ ঘনিয়ে এলেই দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত গার্মেন্টস সেক্টরে এক ধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দানা বাঁধে। ৪ কোটির বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা যে পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, সেই খাতের কারিগর তথা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে টানাপোড়েন আমাদের জাতীয় ললাটে এক কলঙ্কিত তিলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতের দুঃসহ অভিজ্ঞতা আর বর্তমানের নতুনের আহ্বানে দাঁড়িয়ে এখন সময় এসেছে বেতন-বোনাস নিয়ে এই লুকোচুরি খেলার স্থায়ী অবসান ঘটানোর।
আমরা যদি বিগত দেড় দশকের দিকে তাকাই, তবে দেখব পোশাক খাতের শ্রমিকরা বারবার রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছেন শুধু তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির বেতন আর ন্যায্য বোনাসের দাবিতে। বিশেষ করে ঈদের ঠিক দুই বা তিন দিন আগে হঠাৎ কারখানা লে-অফ ঘোষণা করা কিংবা মালিক পক্ষের উধাও হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমরা ভুলে যাইনি, সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি-পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের অসহায়ত্ব কিংবা গাজীপুর ও আশুলিয়ায় বকেয়া বেতনের দাবিতে জ্বলতে থাকা আগুনের লেলিহান শিখা।
অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে দেখা গেছে, মালিকদের একটি বড় অংশ ছিল সরাসরি ক্ষমতার অংশীদার। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে সেখানে আলোচনার পরিবর্তে পুলিশি অ্যাকশন বা লাঠিচার্জ ছিল প্রধান দাওয়াই। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ শ্রমিকদের ঈদ আনন্দ ম্লান হয়েছে, অন্যদিকে রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশ বারবার হোঁচট খেয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বারবার আমাদের শ্রম অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যা বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমনকি ঈদের আগের দিনগুলোতে ঢাকা-ময়মনসিংহ বা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে শ্রমিকদের দীর্ঘ অবরোধের ফলে সৃষ্ট যানজটে গোটা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ার নজিরও কম নয়। এই অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে, শেষ মুহূর্তের ব্যবস্থাপনাই মূলত সংকটের মূল কারণ।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক নতুন মেরুকরণ ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্র সংস্কারের যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তার অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘মানবিক মর্যাদা’ এবং ‘শ্রমের স্বীকৃতি’। প্রধানমন্ত্রী নিজে বারবার বলছেন যে, একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে হলে সবার আগে মেহনতি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনছেন, তার প্রতিফলন গার্মেন্টস সেক্টরেও দেখা জরুরি। তিনি ভিভিআইপি প্রোটোকল ত্যাগ করেছেন, কৃচ্ছ্রসাধনের ডাক দিয়েছেন এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নেতৃত্বের এই পরিবর্তনই আমাদের আশাবাদী করে তোলে যে, এখন আর শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে কোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। সরকার প্রধানের এই সুদৃঢ় অবস্থান মালিক পক্ষকেও একটি কড়া বার্তা দিচ্ছে—ব্যবসা হবে ন্যায়সংগত এবং শ্রমিকদের পাওনা হবে অলঙ্ঘনীয়।
ঈদের বাকি আর অল্প কিছু দিন। আমি মনে করি, এবারের প্রেক্ষাপটে বেতন-বোনাস পরিশোধে কোনোভাবেই ২০ রমজানের বেশি দেরি করা উচিত নয়। তবে চূড়ান্ত সময়সীমা কোনোভাবেই যেন ২২ বা ২৩ রমজানের বেশি না হয়। এর পেছনে কয়েকটি অকাট্য যুক্তি রয়েছে।
১. বাজারের ভারসাম্য ও মধ্যবিত্ত শ্রমিকের আত্মসম্মান: গার্মেন্টস শ্রমিকরা সাধারণত মাসের শেষে বেতন পান। কিন্তু ঈদের কেনাকাটা ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য তাদের হাতে নগদ টাকা থাকা প্রয়োজন। ২৩ রমজানের মধ্যে বেতন-বোনাস পেলে তারা তুলনামূলক সহনীয় বাজারে কেনাকাটা করতে পারবেন। শেষ মুহূর্তে বেতন পেলে উৎসবের বাড়তি চাহিদার কারণে তাদের চড়া মূল্যে পণ্য কিনতে হয়, যা তাদের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
২. সুশৃঙ্খল যাতায়াত: লাখ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক একসঙ্গে গ্রামের পথে রওনা হলে দেশের পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। যদি ২৩ রমজানের মধ্যে পাওনা পরিশোধ হয়, তবে কারখানাগুলো ভাগে ভাগে ছুটি দিতে পারবে। এতে যানজট যেমন কমবে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকিও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
৩. আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষা: বর্তমান সরকার বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। যদি এবার বেতন-বোনাস নিয়ে রাজপথে কোনো অরাজকতা বা আন্দোলনের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যায়, তবে তা সরকারের ইতিবাচক ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তাই কৌশলগত কারণেই সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।
সুপারিশ ও করণীয়:
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা দেশের সম্পদ, কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে, এই শিল্পের ভিত্তি হলো শ্রমিকের ঘাম। ইসলামের বিধান অনুযায়ী ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করুন’—এই শাশ্বত বাণী কেবল বক্তৃতায় নয়, বাস্তব জীবনেও প্রয়োগ করা দরকার।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র মাধ্যমে প্রতিটি কারখানার আর্থিক সক্ষমতা এখনই মনিটর করা জরুরি। যেসব ছোট কারখানা বা সাব-কন্ট্রাক্টিং প্রতিষ্ঠান বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তাদের জন্য বিশেষ ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে হলেও ২৩ রমজানের মধ্যে পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি হেল্পলাইন খোলা হোক, যেখানে শ্রমিকরা তাদের বকেয়া পাওনা নিয়ে অভিযোগ জানাতে পারবেন। কোনোপ্রকার অজুহাতে যেন বেতন-বোনাস নিয়ে টালবাহানা না করা হয় তা যেন নিশ্চিত করা হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের নতুন সরকারের যে স্বপ্ন—একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র গঠন—তার প্রথম পরীক্ষা হতে পারে আসন্ন ঈদে গার্মেন্টস শ্রমিকদের হাসি মুখ নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদিচ্ছা আর মালিকদের দায়িত্বশীলতা যদি একবিন্দুতে মেলে, তবে এবার আর আমাদের মহাসড়কে অশ্রু ঝরতে দেখা যাবে না। ঈদ কেবল ধনী বা মালিকের জন্য নয়, ঈদ হোক সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরের প্রতিটি শ্রমিকের ঘরে। ২৩ রমজানের মধ্যে বেতন-বোনাস পরিশোধ হোক সেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ।
ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ে।

