মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু ভূখণ্ড আছে, যেগুলো শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; বরং দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রতীক। মধ্যপ্রাচ্যের ইরান তেমনই একটি দেশ। আজকের ইরান আসলে সেই প্রাচীন পারস্যের উত্তরাধিকারী, যার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। সাম্রাজ্যের বিস্তার, পরাজয় ও পুনরুত্থান সবকিছু মিলিয়ে ইরানের ইতিহাস মূলত এক দীর্ঘ সংগ্রাম ও প্রতিরোধের কাহিনি।
প্রাচীন পারস্য সভ্যতার সূচনা সাধারণত ধরা হয় সাইরাস দ্য গ্রেটের সময় থেকে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আকেমেনিড সাম্রাজ্য, যা ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। এই সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল বর্তমান ইরান, ইরাক, তুরস্ক, মিশর, মধ্য এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু অংশ পর্যন্ত। কিন্তু সাম্রাজ্যের বিস্তার যেমন দ্রুত ঘটেছিল, তেমনি সংঘাতের ইতিহাসও দ্রুত শুরু হয়।
পারস্যের সঙ্গে প্রথম বড় সংঘাত ঘটে গ্রিকদের সঙ্গে। ইতিহাসে বিখ্যাত গ্রিকো-পারসিয়ান যুদ্ধ ছিল সেই সংঘর্ষের ফল। পারস্য সাম্রাজ্য ইউরোপের দিকে অগ্রসর হলে গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ‘ব্যাটল অব ম্যারাথন’ ইতিহাসে সেই সংঘর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়ে আছে। যদিও সেই যুদ্ধে পারস্য শেষ পর্যন্ত ইউরোপে স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তবু তাদের সামরিক শক্তি ও সংগঠনের ক্ষমতা বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল।
পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আরেকটি বড় মোড় আসে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালে, যখন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য আক্রমণ করেন। তার সেনাবাহিনী পারস্যের রাজধানী পার্সেপোলিস পর্যন্ত দখল করে। সেই সময়ের এই পরাজয় পারস্য সাম্রাজ্যের অবসান ঘটালেও পারস্য সংস্কৃতি বিলীন হয়নি। বরং গ্রিক ও পারস্য সংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি হয় নতুন এক ঐতিহাসিক ধারা।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে পারস্য আবার শক্তি সঞ্চয় করে। ‘সাসানীয় সাম্রাজ্য’ সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল। তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য। দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে বহু বছর ধরে চলা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু এই দীর্ঘ সংঘাতের ফলে উভয় সাম্রাজ্যই দুর্বল হয়ে পড়ে, যার সুযোগ নিয়ে আরবরা দ্রুত অঞ্চলটি দখল করে নেয়। সপ্তম শতাব্দীতে পারস্যে ইসলামের আগমন ঘটে।
মধ্যযুগের আরেক বড় বিপর্যয় আসে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, যখন চেঙ্গিস খাঁনের মঙ্গোল বাহিনী পারস্য আক্রমণ করে। এই আক্রমণে বহু শহর ধ্বংস হয়, অসংখ্য মানুষ নিহত হয় এবং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তবুও পারস্য সভ্যতা আবারও পুনর্গঠিত হয়।
আধুনিক যুগে ইরানের যুদ্ধের ইতিহাস নতুন মাত্রা পায়। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে রাশিয়া ও ব্রিটেনের প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে ইরান বারবার রাজনৈতিক চাপে পড়ে। এই সময়ে দেশটি সরাসরি উপনিবেশ না হলেও বড় শক্তিগুলোর প্রভাবের মধ্যে ছিল।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতগুলোর একটি হলো ইরান-ইরাক যুদ্ধ। আট বছরব্যাপী এই যুদ্ধ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতগুলোর একটি। ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করলে শুরু হয় এই যুদ্ধ। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয় এবং অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। তবু এই যুদ্ধে ইরান তাদের রাষ্ট্রিক অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
বর্তমান সময়ে ইরান আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে। সম্পূর্ণ খামখেয়ালির বশে আমেরিকা-ইসরাইল স্বাধীন সার্বভৌম ইরানের ওপর আক্রমণ করে চলেছে। তবে ইরানও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়; মোক্ষম জবাব ঠিকই দিচ্ছে। আমেরিকার কপালে এখন গভীর চিন্তার ভাঁজ।
ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, এই ভূখণ্ড বারবার আক্রমণের শিকার হলেও তার সভ্যতা কখনো সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি। সাম্রাজ্য হারিয়েছে, রাজধানী ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনা টিকে থেকেছে। পারস্যের কবিতা, দর্শন, শিল্প ও বিজ্ঞান আজও বিশ্বসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের একটি বাস্তব সত্য মনে করিয়ে দেয় শক্তির রাজনীতি সাময়িক হতে পারে, কিন্তু সভ্যতার ধারাবাহিকতা অনেক বেশি স্থায়ী। ইরানের ইতিহাস সেই স্থায়িত্বেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। যুদ্ধ ও সংঘাতের মাঝেও যে একটি জাতি তার সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় ধরে রাখতে পারে, পারস্য সভ্যতা তারই প্রমাণ।
আজকের বিশ্ব নতুন নতুন সংঘাতের মুখোমুখি হচ্ছে। আর ইরানের হাজার বছরের ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় যুদ্ধ কি সত্যিই স্থায়ী সমাধান দিতে পারে, নাকি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কেবল সভ্যতার শক্তিই?
লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

