× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

নিউরোসায়েন্সের আলোকে মানবিকতার সংকট

এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

দক্ষিণ ভারতের প্রত্যন্ত তামিল গ্রাম। জীর্ণ বিছানায় শুয়ে আছেন এক মুমূর্ষু বৃদ্ধা। তার দুর্বল শ্বাস-প্রশ্বাসটুকু যেন খসে পড়া সুতোর মতো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি শারীরিক নড়াচড়ায় তীব্র যন্ত্রণা। কালচে হয়ে আসা চোখ দুটো এমন এক পরম শান্তির খোঁজ করছে, যা এই খয়ে যাওয়া শরীর আর দিতে পারছে না। বিছানা ঘিরে শান্ত হয়ে বসে আছেন পরিবারের সদস্যরা। কঠোর পরিশ্রমে তাদের হাতগুলো শক্ত হয়ে গেলেও, বৃদ্ধার প্রতি ছোঁয়াটুকু পরম মমতাময়। ঘরের ভেতর এক ভারী নীরবতা, তবে এ নীরবতা অবহেলার নয়, বরং এক বুকভাঙা শান্ত আত্মসমর্পণের। এই পরিবারটি বিশ্বাস করে, যখন শরীর কেবল যন্ত্রণার খাঁচা হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রিয়জনকে মুক্তি দেওয়াই প্রকৃত ভালোবাসা। ‘থালাইকুথাল’ নামের এই সামাজিক রীতিতে senicide এর মাধ্যমে প্রিয়জনের মৃত্যুকে সহজ করে দেওয়াকে অপরাধ নয়, বরং তা সহানুভূতি, সহমর্মিতা আর ভালোবাসার শেষ উপহার মনে করা হয় তাদের সামাজিক জীবনে।

অথচ, সেখান থেকে হাজার মাইল দূরে বাংলার এক ৯২ বছর বয়সী বাবা হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে বেঁচে আছেন। চারদিকে মেশিনের যান্ত্রিক শব্দ আর স্বজনদের উদ্বেগ। এই পরিবারের কাছে মেশিনের প্রতিটি শব্দই আশার আলো। যেকোনো মূল্যে, আরও একটি দিন বা একটি ঘণ্টার জন্য হলেও তারা বাবাকে বাঁচিয়ে রাখতে চান। সেখানে হাল ছেড়ে দেওয়াকে মনে করা হয় মহাপাপ। এই পরিবারের কাছে সহমর্মিতা, ভালোবাসা আর সহানুভূতি হল বাবাকে আরও কিছুদিন ধরে রাখার আপ্রান প্রচেস্টা।

আমরা মনে করি সহমর্মিতা বা ‘এম্প্যাথি’ সব মানুষের জন্য একই রকম, কিন্তু আসলে তা নয়। শৈশবের অভিজ্ঞতা, গল্প, কবিতা, সুর, ছন্দ, এবং চারপাশের পরিবেশ অর্থাৎ সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ামকে তৈরি হয় মানুষের মন। কোনো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে প্রায়ই একটি অদ্ভুত সামাজিক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। দেখা যায়, রাস্তার দিনমজুর, রিকশাচালক বা হকাররা নিজেদের কাজ ফেলে আহতদের সাহায্য করতে সবার আগে ছুটে আসেন। অন্যদিকে, দামি বিলাসবহুল গাড়ির মালিকেরা প্রায়ই গতি বাড়িয়ে দুর্ঘটনাস্থল পাশ কাটিয়ে চলে যান। এই উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আচরণের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত দেখা যায়, তা কেবলই কোনো মানবিক বা নৈতিক গুণাবলীর পার্থক্য নয়, এর পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের জটিল বিজ্ঞান, নিউরোবায়োলজি এবং সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাস। জীবনে বেঁচে থাকার লড়াই এবং চারপাশের পরিবেশ কীভাবে আমাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠনকে বদলে দেয়, তা বিশ্লেষণ করলেই এই রহস্যের উত্তর পাওয়া যায়।

দিনমজুর, রিকশাচালক বা হকারের মতো শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন এক কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হন। অভাব, শারীরিক ক্লান্তি আর বেঁচে থাকার তীব্র লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই কাটে তাদের জীবন। এই অবিরাম জীবনসংগ্রামের ফলে তাদের মস্তিষ্কে এক অসাধারণ রূপান্তর ঘটে। নিউরোসায়েন্সের ভাষায়, মানুষের মস্তিষ্কের প্রধান ইনহিবিটরি নিউরোট্রান্সমিটার হলো ‘গাবা’ (GABA - Gamma-Aminobutyric Acid), যা মূলত মস্তিষ্কের অতিরিক্ত উত্তেজনা, ভয় এবং উদ্বেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন এবং চারপাশের পরিবেশে দুঃখ, কষ্ট আর পারস্পরিক দয়া ও মায়ার উদাহরণের মাঝেই তারা বড় হন। এই ক্রমাগত অভিজ্ঞতার ফলে তাদের মস্তিষ্কের ‘গাবা’ ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সক্রিয় ও পরিপক্ব হয়ে ওঠে। তাদের ব্রেইনে এই নিউরোট্রান্সমিটারের আধিপত্যের কারণে অন্যের দুঃখ-কষ্টকে নিজের করে অনুভব করতে পারেন। দিন-রাত আনন্দে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা কোনো রক্তাক্ত ব্যাপার কিংবা দুর্ঘটনা দেখলে যেখানে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়েন, সেখানে শ্রমজীবী মানুষের মস্তিষ্ক এই তীব্র মানসিক চাপকে দ্রুত সামলে নিতে পারে। আকস্মিক ধাক্কায় ঘাবড়ে না গিয়ে তারা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। তাদের মস্তিষ্ক অন্যের দুঃখ-যন্ত্রণাকে কোনো অপরিচিত দূরবর্তী বিষয় মনে করে না। যেহেতু তারা নিজেরাও দুর্ভোগ আর কষ্টের সাথে পরিচিত, তাই তাদের অবচেতন মন অন্যের কষ্টকে এক ‘পরিচিত প্রতিবেশী’ হিসেবে গ্রহণ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ‘রেজিলিয়েন্ট এমপ্যাথি’, যা টিকে থাকার প্রয়োজনে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে সামাজিক বন্ধনকে মজবুত করার প্রাকৃতিক কৌশল।

এর ঠিক বিপরীত চিত্রটি দেখা যায় বিত্তবান বা বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত মানুষের ক্ষেত্রে। আরাম-আয়েশ, প্রাচুর্য এবং তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণের পরিবেশ তাদের মস্তিষ্কের অপারেশন পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে গঠন করে। বিলাসিতা আর আনন্দের সুরক্ষায় ঘেরা পরিবেশে থাকা মানুষের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ বা আনন্দের হরমোন অত্যন্ত বেশি সক্রিয় থাকে। এই ডোপামিনের চক্র মানুষকে সবসময় মজার অনুভূতি, সুখ এবং আরামের দিকে টানে এবং যেকোনো ধরণের অস্বস্তি বা কষ্ট থেকে দূরে রাখতে চায়। ধনী পরিবেশে বড় হওয়া মানুষের মস্তিস্কে ডোপামিনের স্রোত ডোমিনেট করে ফলে যখন এই ধরণের মানুষ হঠাৎ রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা বা যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্য দেখেন, তখন তাদের ডোপামিনের মোহে থাকা মস্তিষ্কে আক্ষরিক অর্থেই এক তীব্র রাসায়নিক বিপর্যয় বা ‘ডোপামিন ক্র্যাশ’ ঘটে কিন্তু প্রায়ই এই আকস্মিক মানসিক ও রাসায়নিক ধাক্কা সহ্য করার মতো প্রস্তুতি সেইসব মস্তিষ্কের থাকে না। ফলে, নিজেদের মানসিক ভারসাম্য ও ভেতরের শান্ত পরিবেশকে রক্ষা করার জন্য তাদের মস্তিষ্ক এক ধরণের স্বয়ংক্রিয় আত্মরক্ষা কবচ তৈরি করে। এর ফলেই জন্ম নেয় ‘এড়িয়ে চলার আচরণ’ বা Avoidance Behavior। তারা অবচেতনভাবেই দুর্ঘটনাস্থল থেকে চোখ ফিরিয়ে নেন এবং দ্রুত গাড়ির গতি বাড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। এমন মানুষেরা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসুস্থ্যতার সংবাদে টাকা খরচ করেন কিন্তু বিদেশ থেকে ফিরে এসে বাবা-মায়ের শিওরে একটু বসার সময় তাদের হয় না।

প্রাচুর্য মানুষের মধ্যে এক চরম স্বাধীন চেতনার জন্ম দেয়, যেখানে কেউ কারও ওপর নির্ভরশীল নয়। টাকা থাকলে যেকোনো সেবা কিনে নেওয়া সম্ভব, এই অনুভব মানুষকে সামষ্টিক সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই অতি-স্বাতন্ত্র্যবাদ মানুষের অজান্তেই তৈরি করে ‘সহমর্মিতার অন্ধত্ব’ বা Empathic Blindness। এই অবস্থায় ব্যক্তির মস্তিষ্ক অন্য মানুষের কষ্টের পাশে এসে সাহায্য করার প্রয়োজনকে ‘অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয়’ হিসেবে নথিভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়। নিউরোসায়েন্সের গবেষণা এই পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মস্তিষ্কের ‘মিরর নিউরন সিস্টেম’ এর মাধ্যমে। ‘মিরর নিউরন সিস্টেম’ মানুষের মস্তিষ্কের এমন এক কোষীয় নেটওয়ার্ক, যা অন্য কাউকে আনন্দিত হতে কিংবা কষ্ট পেতে দেখলে নিজেদের মস্তিষ্কেও হুবহু সেই অনুভূতি বা উদ্দীপনা তৈরি করে। এর অর্থ হল মিরর নিউরন সিস্টেম অপরের অনুভব নিজের ভেতরে অনুভব করার ক্ষমতা দেয়। শোকগ্রস্ত পরিবেশে উপস্থিত হলে নিজের অজান্তেই আপনার অন্তর ভারী হয়ে ওঠে, আবার হাস্য-কলাহলে মত্ত বন্ধুদের আড্ডায় হঠাৎ হাজির হলে অজান্তেই আপনার চেহারাতেও হাসি ফুটে ওঠে; এই যে আচরণ সেটা কিন্তু ঐ মিরর নিউরনেরই খেলা। এই সিস্টেমটি সহমর্মিতার জৈবিক ‘হার্ডওয়্যার’ যা প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কেই জন্মগতভাবে জমা রয়েছে। কিন্তু এই হার্ডওয়্যারটি কীভাবে কাজ করবে, তার দিক এবং শক্তি নির্ধারণ করে আমাদের অভ্যাসের ‘সফটওয়্যার’।

শৈশবের শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং বড়দের আচরণ দেখে আমাদের মস্তিষ্কের এই সফটওয়্যারটি মজবুত হয়। আমরা যদি এমন এক সামাজিক পরিবেশে বড় হই যেখানে আবেগীয় সংবেদনশীলতা, অপরের প্রতি যত্ন এবং পরোপকারকে নিয়মিত চর্চা করা হয় এবং সেটিকে সম্মানজনক আচরণ বলে প্রচার করা হয়, তবে মস্তিষ্কের সহমর্মিতার সক্ষমতা আরও মজবুত ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু উন্মত্ত আনন্দ, বিলাস, আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবেশে বড় হলে এই শক্তিশালী হার্ডওয়্যারটিও এক সময় অলস ও অকেজো হয়ে পড়ে।

এতক্ষণে স্পষ্ট যে, মানুষের জীবনে সহমর্মিতা কোনো জাদুকরী বা অলৌকিক বিষয় নয়; এটি মূলত আমাদের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে নিউরোট্রান্সমিটারের খেলা এবং 'মিরর নিউরনে'র কারসাজি। তবে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একটি মানসিক অভ্যাস। আমাদের অবচেতন মন বাস্তবতার সাথে কোনো ছবি, গল্প বা কল্পনার পার্থক্য করতে পারে না। ফলে আমরা প্রতিনিয়ত যেসব ছবি বা ভিডিও দেখছি, যে ধরনের গল্প বা আড্ডায় সময় কাটাচ্ছি, কিংবা মিডিয়া যা কিছু বেশি প্রচার করছে, তার সবই আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরনের বাইনারি প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। আমাদের শিল্পীরা যে শব্দে গান বাঁধছেন, কবিরা কেমন কবিতা লিখছেন, কিংবা মানুষেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেমন ছবি ও পোস্ট শেয়ার করছেন, তার প্রতিটি উপাদান আমাদের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করছে। মন্দ কথা শুনাও পাপ, কারণ মন্দ কথাগুলো স্রোতার ব্রেইনকে মন্দের দিকে আকর্ষণ করে; মন্দের প্রচার কেবল মন্দকেই শক্তিশালী করে, সম্ভবত এ কারনেই মহান আল্লাহ্ যে কোন প্রকার মন্দের প্রচার কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন।

লেখক: মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক

Link copied!