× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

পারস্পরিক নির্ভরতাই মানব সম্পর্কের সৌন্দর্য

এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

মানুষ সৃষ্টির সেরা অথচ শৈশব থেকেই মানুষ পরনির্ভরশীল। জগতে বাঘ, ঈগল কিংবা ব্ল্যাক প্যান্থারের মতো বহু ‘সলিটারি’ প্রাণী রয়েছে; ওরা জন্মের পর থেকেই একাই একশো, তারা একা একাই বেঁচে থাকে। প্রকৃতির এই নিয়মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানুষকে কেন মহান স্রষ্টা এমন করলেন যে, একে অপরের সাহায্য ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকাই অসম্ভব?

এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা হাজির হয়েছিলাম এক প্রবীণ দম্পতির ৬৫তম বিবাহবার্ষিকীর পারিবারিক আড্ডায়। যেখানে সমাজবিজ্ঞানের প্রাক্তন শিক্ষক দাদু এবং দাদিমা তাদের কফির কাপ আর বয়ামের মুখের এক অতি সাধারণ গল্প দিয়ে উন্মোচন করলেন পারস্পরিক বন্ধনের সবচেয়ে গভীর মনস্তাত্ত্বিক রহস্য।

দাদু বললেন, ‘আমি তো তোমার দাদিমা ছাড়া একদম অসহায়। এই যে কফিটা খাব, তাও নিজে বানাতে পারি না। আর তোমার দাদিমাও বোঝেন যে আমি তাকে ছাড়া কতটা অসহায়, তাই তার গভীর মায়া জড়িয়ে আছে আমার ওপর।’ পাশ থেকে দাদিমা হেসে যোগ করলেন, ‘ও কফি খেতে চায়, কিন্তু আমি আবার কফির বয়ামের শক্ত মুখটা খুলতে পারি না। তাই বয়ামটা ওর কাছে নিয়ে বলি, একটু খুলে দাও না! আমি যে দুর্বল আর তোমার দাদুর ওপর শতভাগ নির্ভরশীল, সেটা অনুভব করতে পারে বলেই ও আমায় এত ভালোবাসে।’

মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বয়ামের মুখ খোলা আর কফি বানিয়ে দেওয়ার গল্পটি কেবল সাধারণ কোনো পারিবারিক খুনসুটি নয়; এটি মূলত পারস্পরিক আবেগকে সম্মান করা এবং তা যত্ন নেওয়ার এক জীবন্ত মনস্তাত্ত্বিক দলিল। ভালোবাসা, মমতা এবং সহমর্মিতার মতো উচ্চতর অনুভূতিগুলো আকাশ থেকে পড়ে না, বরং এগুলো বিকশিত হয় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।

দাদিমার ১৩ আর দাদুর ছিল ১৯বছর; এই বয়সে বিয়ের গল্পটি আমাদের ফেলে আসা বাঙালি সমাজের এক গভীর সামাজিক বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আজ থেকে মাত্র এক শতাব্দী আগেও আমাদের সমাজ কাঠামোয় খুব ছোট বয়সে, এমনকি শিশুদেরও বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো। তবে বর্তমান যুগের মনস্তত্ত্বে ‘বিয়ে’ বলতে আমরা যা বুঝি, তখন কিন্তু বিষয়টি মোটেও তেমন ছিল না; সে সময়ে বিয়ে এবং দাম্পত্য জীবন এক বিষয় ছিল না। বরং সেই বাল্যবিয়ে ছিল মূলত দুটি পরিবারের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধনের  ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। একে তুলনা করা যায় গাছের একটি কচি অংকুর এনে আরেকটি সবুজ বৃক্ষের গায়ে পরম যত্নে ‘কলম’ বসানোর সাথে। শিশু দুটি ছিল ঠিক তেমনি, দুটি পরিবারের মৈত্রীর স্রেফ এক মধুর উপলক্ষ। উদ্ভিদের সেই কলমটি যেমন ধীরে ধীরে একসময় সেই গাছেরই অবিচ্ছেদ্য ডালপালা হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি শিশুটিও নতুন পরিবারের আলো-বাতাস, সংস্কৃতি আর স্নেহের মাঝে ধীরে ধীরে বড় হতো। একসাথে বড় হওয়ার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাঝেই, কোনো কৃত্রিমতা ছাড়া, তাদের অবচেতন মনে গড়ে উঠত এক অভেদ্য আত্মিক টান বা ‘অ্যাটাচমেন্ট’। মূলত এই শেকড়ের বন্ধনই তাদের দাম্পত্যকে আজীবন অটুট রাখার শক্তি জোগাত।  এটিই ছিল হাজার বছর ধরে বয়ে চলা আমাদের কালেক্টিভিস্ট সোসাইটির ইঞ্জিনিয়ারিং কিন্তু এর বিপরীতে আজ পাশ্চাত্যের  অতি-ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এক নীরব সামাজিক পরিবর্তন ডেকে এনেছে। 

অতি-ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বা Hyper-independence, আসলে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন মানসিক ট্রমা। এর ফলে মানুষ মনে করে, "আমার কাউকে প্রয়োজন নেই, আমি একাই নিজের জন্য যথেষ্ট।" আজ আমরা পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীর সাথে কথা বলি না, এমনকি তাদের চিনিও না। আমাদের বিনোদন, নিরাপত্তা কিংবা দৈনন্দিন কোনো সাহায্যের জন্যই প্রতিবেশীর ওপর নির্ভর করতে হয় না। আত্মীয় বা বন্ধুর মমতাময় মানসিক সমর্থনের চেয়ে এখন ‘লাইক-কমেন্ট’ এবং ভার্চুয়াল রিয়্যাকশনের উত্তেজনা দিয়ে আবেগীয় শূন্যতা পূরণের সংস্কৃতি চালু  হয়েছে। তবে এই যান্ত্রিক স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় আঘাতটি পড়েছে দাম্পত্য জীবনের ওপর। অনেকেই এখন পারিবারিক জীবনে যুক্ত থাকার মনস্তাত্ত্বিক তাগিদটাই হারিয়ে ফেলছেন। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার জন্য, কিংবা জীবনের কঠিন মুহূর্তে একজন আরেকজনের ‘আত্মার আত্মীয়’ বা Soulmate হওয়ার যে চিরন্তন মানবিক প্রয়োজনীয়তা, আধুনিক মানুষ আজ তা অনুভব করতে পারছে না। সম্পর্কের গভীরতার চেয়ে নিজেদের অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতাকে বেশি মূল্যবান মনে হচ্ছে তাদের। তারা  অনুভব করতে পারছে না যে স্রষ্টার ডিজাইনে স্ক্রিনের আলো দিয়ে হৃদয়ের একাকীত্ব দূর করার ব্যবস্থা রাখা হয় নাই; বরং আত্মার শূন্যতা পূরণের জন্য আরেকটি আত্মারই প্রয়োজন।

অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় বিশ্বব্যাপী পরিবার প্রথা আজ হুমকির মুখে। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে এর এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৫% তরুণ-তরুণী তাদের জীবনে কখনোই বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এছাড়া দেশটির প্রায় ৫০% অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক দাম্পত্য সম্পর্কে জড়াতে সম্পূর্ণ অনীহা প্রকাশ করেছেন। ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপে গত কয়েক দশকে বিবাহের হার প্রায় ৫০% কমে গেছে এবং বিবাহবিচ্ছেদের হার দ্বিগুণ হয়েছে। ইউরোপের নারীদের গড় প্রজনন হার বর্তমানে মাত্র ১.৪৬, যা একটি জনসংখ্যা টিকিয়ে রাখার ন্যূনতম হার ২.১ এর থেকে অনেক কম। জাপানের জাতীয় জনসংখ্যা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশটিতে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৪২% পুরুষ এবং ৪৪% নারী চিরকাল অবিবাহিত থাকার মানসিকতা পোষণ করছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রজনন হার বিশ্ব সর্বনিম্ন যা মাত্র ০.৭২, যেখানে তরুণ নারী প্রজন্মের একাংশ 4B নামক একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছে, যার মূল কথাই হলো: কোনো সম্পর্ক নয়, কোনো বিয়ে নয় এবং কোনো সন্তান নয়। 

দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি বিশ্বব্যাপী অনীহার পেছনে কাজ করছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক সংকট যা নারী ও পুরুষ উভয়ের মাঝেই তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতার জটিল সমীকরণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, পারিবারিক অসমতা এবং ক্যারিয়ারের পাশাপাশি এককভাবে সংসারের বোঝা টানার ক্লান্তি  বা Psychological Burnout থেকে বিশ্বজুড়ে নারীরা আজ ফুঁসে উঠছেন। পুরুষদের অন্যায্য আচরণ, ভায়োলেন্স এবং আবেগীয় সমর্থনের অভাবের বিরুদ্ধে এটি তাদের এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ। বিপরীত পিঠে, আধুনিক সমাজ ও আইনি কাঠামোর অপব্যবহার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীদের অতি-নিয়ন্ত্রণ  মানসিকতা ও অন্যায্য চাহিদার শিকার হয়ে পুরুষদের একটি বড় অংশ আজ কোণঠাসা। অনেক পুরুষই এখন বিয়ে এবং দাম্পত্য জীবনকে মানসিক ‘অভিশাপ’ বা আইনি ও অর্থনৈতিক ফাঁদ হিসেবে দেখছেন। এই দুই বিপরীতমুখী ক্ষোভের কারণে সমাজ থেকে ‘পারস্পরিক আস্থার জায়গা’ বা Trust Capital হারিয়ে যাচ্ছে ফলে নারী ও পুরুষ একে অপরকে ‘জীবনসঙ্গী’ বা পরিপূরক ভাবার পরিবর্তে একে অপরের ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। 

আমরা সুন্দর সম্পর্ক চাই, প্রশান্তির পরিবার পেতে আকাঙ্ক্ষা করি কিন্তু মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, সম্পর্ক কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট আবেগীয় আদান-প্রদান এবং এক সুনিপুণ সামাজিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফলাফল। দাদুর কফি বানাতে না পারা কিংবা দাদিমার বয়ামের মুখ খুলতে না পারার মাঝে কোনো হীনম্মন্যতা ছিল না; বরং তা ছিল প্রিয় মানুষকে বিশেষ অনুভব করানোর এবং একে অপরের আবেগকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করার এক অভিনব মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। তাই, আজকের অতি-আত্মনির্ভরশীলতার যুগে দাঁড়িয়ে, ব্যক্তিস্বাধীনতা বজায় রেখেও কীভাবে মজবুত পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ধরে রাখা যায়, সেই সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। মানব প্রজাতির প্রতিরক্ষার স্বার্থেই আমাদের এখন এমন এক সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিতে হবে, যেখানে একজনের সাহায্যে পাশে এসে দাঁড়ানোকে কোনো করুণা নয়, বরং একটি ‘সম্মানিত সুযোগ’ হিসেবে দেখা হবে। অন্যকে সাহায্য করা কেবল ‘পরোপকার’ নয়, বরং তা যে নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য এক ধরণের ‘আত্মোপকার’ এই সত্যটির ব্যাপক প্রচার আজ সমাজজুড়ে দরকার। দাদু-দাদিমার সেই ৬৫ বছরের কফির কাপের চিরায়ত গল্পের মতো, আমাদের সমাজটাও যেন পারস্পরিক গভীর মায়ার এক অনন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে, এটাই হোক আমাদের নতুন যুগের সামাজিক শপথ।

লেখক: মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক

Link copied!