× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম

প্রাথমিক শিক্ষার নতুন স্বপ্নের দুয়ারে বাংলাদেশ

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

একটি ইতিবাচক জাতি গড়তে হলে অবশ্যই প্রাথমিক শিক্ষার আধুনিকিকরণ জরুরী। প্রাথমিক শিক্ষাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল স্তম্ভ। কারণ এখানেই গড়ে ওঠে শিশুর চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং নাগরিক চেতনার ভিত। সেই জায়গা থেকে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, সদিচ্ছা এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক এবং সময়োপযোগী।

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনি অঙ্গীকারেই শিক্ষাকে জাতির সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার ঘোষিত লক্ষ্য হলো একটি আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী ও সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে রেকর্ড বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। 

আসন্ন বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ উন্নীত করা হচ্ছে ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, যা আগে ছিল ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও (এডিপি) শিক্ষা খাতে ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই উদ্যোগ কেবল সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বদলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, সরকার শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষার গুণগত রূপান্তর নিয়েও ভাবছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ফ্রি ওয়াই-ফাই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার এসব উদ্যোগ ভবিষ্যৎমুখী চিন্তারই প্রতিফলন। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং দ্রুত শেখার মানসিকতা গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে ‘লার্নিং উইথ প্লে’ বা খেলতে খেলতে শেখার ধারণা শিশু শিক্ষাকে ভয়ভিত্তিক কাঠামো থেকে আনন্দময় অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করতে পারে।

শুধু প্রযুক্তি নয়, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমতাকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। মিড-ডে মিল কার্যক্রম, পাটের তৈরি স্কুল ব্যাগ ও ড্রেস বিতরণ, নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া এসব উদ্যোগ একটি মানবিক শিক্ষা রাষ্ট্র গঠনের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক কার্যক্রম, কমিউনিটি সম্পৃক্ততা এবং অভিভাবক অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয়।

তবে পরিকল্পনা যত বড়ই হোক, বাস্তবতার মাটিতে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। মূল সমস্যা শুরু হয় বৈষম্য দিয়ে। দেশে একইসঙ্গে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইংরেজি মাধ্যম, কওমি ও এবতেদায়ী মাদ্রাসা, এনজিও স্কুল, প্রি-ক্যাডেটসহ বহু ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। 

ফলে একটি অভিন্ন মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামো তৈরি করা এখনো সম্ভব হয়নি। শহর ও গ্রামের ব্যবধানও প্রকট। রাজধানীর একটি শিশু যেখানে ডিজিটাল ক্লাসরুম পাচ্ছে, সেখানে অনেক গ্রামীণ শিক্ষার্থী এখনো পর্যাপ্ত বই-খাতা কিংবা পুষ্টিকর খাবার থেকেও বঞ্চিত।

শিক্ষকদের দক্ষতা ও মানগত সীমাবদ্ধতাও বড় একটি বাস্তবতা। প্রযুক্তি হাতে তুলে দিলেই শিক্ষা আধুনিক হয় না, বরং প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সক্ষমতা তৈরি করতে হয়। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্প সফল করতে হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মনিটরিং এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি ডিভাইস বিতরণ কর্মসূচিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

আরেকটি বড় সংকট হলো দারিদ্র্য ও শিশুশ্রম। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশে শিশুশ্রমের হার আবার বাড়ছে। অনেক শিশু পরিবার চালাতে অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। ক্ষুধার্ত শিশুর কাছে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে জীবিকার প্রশ্নই বড় হয়ে ওঠে। ফলে স্কুলে ভর্তি বাড়লেও নিয়মিত উপস্থিতি এবং শেখার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানেই মিড-ডে মিল বা স্কুল ফিডিং কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ও পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম বড় সংকট হলো অভিভাবকদের একাংশের অসচেতনতা এবং শিশুদের মধ্যে তৈরি হওয়া স্কুলভীতি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার এখনো শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে নয়, বরং তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করে। ফলে শিশুদের একটি বড় অংশ খুব অল্প বয়সেই শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে কিংবা অনিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ে আসছে। অনেক অভিভাবক এখনো বুঝতে পারেন না যে, একটি শিশুর মানসিক বিকাশ, সামাজিক দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। 

অন্যদিকে বিদ্যালয়ের পরিবেশও অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, স্বাস্থ্যসম্মত ও আলাদা টয়লেট ব্যবস্থা নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে, এমনকি অনেক শ্রেণিকক্ষও ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থীপূর্ণ। বিশেষ করে মেয়েশিশুদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাব বিদ্যালয় বিমুখতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাস্তবে এখনো অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ মানে কেবল বই মুখস্থ করা, পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া এবং শাসনভিত্তিক একঘেয়ে জীবন। 

ফলে শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও আনন্দময় শেখার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত যে, প্রাথমিক শিক্ষাকে আনন্দভিত্তিক, খেলাধুলা ও অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমনির্ভর না করতে পারলে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশ পূর্ণতা পায় না। সরকার ‘লার্নিং উইথ প্লে’, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু এগুলোর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিশুবান্ধব শিক্ষা সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

একইভাবে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সামাজিক দায়বদ্ধতার ঘাটতিও একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যা। শিক্ষা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের যৌথ দায়িত্বের জায়গা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি বা স্থানীয়  রাজনৈতিক প্রভাবে নানা অনিয়মের কারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না সরকার। স্কুলের উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশও বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন বা শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে নিয়মিত তদারকিতে যুক্ত থাকেন না। ফলে শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, অবকাঠামোগত দুর্বলতা কিংবা শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার মতো বিষয়গুলো অনেক সময় অদৃশ্য সমস্যায় পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি সক্রিয় সামাজিক অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে। 

প্রসঙ্গত, নিয়মিত মা সমাবেশ, অভিভাবকদের নিয়ে বৈঠক, কমিউনিটি মনিটরিং, হোম ভিজিট এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক জবাবদিহি শক্তিশালী করা গেলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শেখার মান দুটোই বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্প, ট্যাব কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ব্যবস্থাগুলোর কার্যকর ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। 

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন দেখিয়েছে। ঝরে পড়ার হার কমেছে, ভর্তি বেড়েছে, নতুন বই বিতরণ এবং উপবৃত্তি কার্যক্রম ইতিবাচক ফল দিয়েছে। অতীতের এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকার যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে পারে, তবে প্রাথমিক শিক্ষায় সত্যিকারের রূপান্তর সম্ভব।

এটা বলাই যুক্তি সংগত,  শিক্ষা কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকারে অভিযাত্রা। ধারণা করি, বর্তমান সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো সেই অঙ্গীকারের ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের সক্ষমতা, ধারাবাহিকতা এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি শিশুকেন্দ্রিক সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই হয়তো বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা সত্যিকার অর্থে বৈষম্যহীন, আধুনিক ও মানবিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে। 

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি ও কথাশিল্পী

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!