যখন দেশের তরুণ সমাজকে ঘিরে হতাশা, বিভ্রান্তি কিংবা আত্মকেন্দ্রিকতার গল্প বেশি উচ্চারিত হয়, তখন কিছু মানুষ নীরবে তৈরি করেন ভিন্ন এক ইতিহাস। মুহাম্মদ আবু আবিদ সেই ব্যতিক্রমী মানুষদের একজন—যিনি শুধু স্বপ্ন দেখেন না, বরং সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করাতে জানেন। সাংবাদিকতা, সামাজিক নেতৃত্ব ও মানবিক কর্মকাণ্ড—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে ধারণ করে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব এক অনন্য পরিচয়।
চট্টগ্রামের হালিশহরে জন্ম হলেও তার শেকড় পটুয়াখালীর দশমিনায়। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। নাটক, আবৃত্তি, বিতর্ক কিংবা সামাজিক উদ্যোগ—সবখানেই ছিল তার সক্রিয় উপস্থিতি। কৈশোরেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, মানুষের জন্য কাজ করার মাঝেই লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। নেতৃত্ব দেওয়ার সহজাত দক্ষতা ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় সাংবাদিকতা ও সামাজিক আন্দোলনের বিস্তৃত পরিসরে।
দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন সমাজের বাস্তবতা, মানুষের সংগ্রাম এবং অদেখা কষ্টের গল্প। বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইটভিত্তিক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মোহনা টিভির চিফ এডিটর (প্ল্যানিং, অনলাইন ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলাচ্ছেন দক্ষতার সঙ্গে। তিনি টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ট্র্যাব)-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্র এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন ক্রাইম রিপোর্টার্স সোসাইটি (ডিএমসিআরএস)-এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে মুহাম্মদ আবু আবিদকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এনেছে তার প্রতিষ্ঠিত ‘দূর্বার তারুণ্য ফাউন্ডেশন’। ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠন অল্প সময়েই তরুণদের মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। মুহাম্মদ আবু আবিদ এর বিশ্বাস—সমাজসেবা মানে শুধু দান নয়; বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলা, সহমর্মিতার সংস্কৃতি তৈরি করা। আর সেই দর্শন থেকেই একের পর এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করে সংগঠনটি।
ফাউন্ডেশনের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘আমরা মালি’। এটি শুধু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়; বরং গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেটিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ববোধ তৈরির এক সামাজিক আন্দোলন। পরিবেশ সচেতনতার এই ব্যতিক্রমী ধারণা তরুণদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। লাখো তরুণ নিজ উদ্যোগে এতে সম্পৃক্ত হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
শুধু পরিবেশ নয়, সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষের পাশেও দাঁড়িয়েছে দূর্বার তারুণ্য ফাউন্ডেশন। ‘ফ্রি ঈদ শপিং’, ‘ফুড ফর অল’, ‘শীতের উষ্ণ আহার’, ‘আমরা মানুষ’, ‘বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ আনন্দ’, ‘ভিন্নধর্মী ভালোবাসা দিবস’ কিংবা ‘বখশিস মেলা’— প্রতিটি আয়োজনেই উঠে এসেছে মানবিকতার ভিন্ন এক সৌন্দর্য। এখানে সাহায্যকে করুণা হিসেবে নয়, বরং মর্যাদা ও সম্মানের জায়গা থেকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।
মুহাম্মদ আবু আবিদের আরেকটি প্রশংসনীয় দিক হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে তার দৃঢ় অবস্থান। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সংগঠনটি সদস্য ফি বা প্রচলিত অনুদাননির্ভর কাঠামোর লবাইরে গিয়ে প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা মডেলে পরিচালিত হয়। প্রতিটি উদ্যোগের পরিকল্পনা, ব্যয় ও কার্যক্রম প্রকাশ করার বিষয়টিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তরুণদের মাঝে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও এই উদ্যোগ ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
তার সামাজিক নেতৃত্ব ও মানবিক কর্মকাণ্ড দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠনের স্বীকৃতিও পেয়েছে। তবে নানা সাক্ষাৎকারে মুহাম্মদ আবু আবিদ বারবার বলেছেন—মানুষের ভালোবাসাই তার সবচেয়ে বড় অর্জন। এই বিনয়, দায়বদ্ধতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো তাকে তরুণদের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ও অনুপ্রেরণার প্রতীক করে তুলেছে।
আজকের বাংলাদেশে যখন ইতিবাচক তরুণ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভূত হচ্ছে, তখন মুহাম্মদ আবু আবিদের পথচলা হয়ে উঠতে পারে এক অনন্য উদাহরণ। কারণ তিনি দেখিয়েছেন—পরিবর্তন শুধু বড় বড় স্লোগানে আসে না; কখনও একটি মানবিক উদ্যোগ, একটি সচেতন চিন্তা কিংবা কয়েকজন স্বপ্নবাজ তরুণও বদলে দিতে পারে অসংখ্য মানুষের জীবন।

