ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তারেক রহমান ফিরছেন দেশে

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫, ০৫:০৭ পিএম
বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফিরতে যাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে তার এই প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

৬০ বছর বয়সি তারেক রহমান বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) ঢাকায় পৌঁছাবেন বলে জানিয়েছে বিএনপির সূত্র। তিনি ২০০৮ সালে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়নের অভিযোগ তুলে দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন এবং তখন থেকেই লন্ডনে বসবাস করছিলেন।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, তিনি দলের নেতৃত্বে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবেন এবং তার অসুস্থ মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছ থেকে কার্যত দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ৮০ বছর বয়সি খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। যদিও তিনি নভেম্বর মাসে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ নেবেন, তবে সেই ঘোষণার পরপরই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং বর্তমানে তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রয়েছেন।

এই নির্বাচনটি হবে গত বছর সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যার ফলে শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনা একাধিক গুরুতর মামলার নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলায় অনুপস্থিতিতে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, যেখান থেকে তিনি খালাস পান। তিনি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ‘২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান ঢাকার মাটিতে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন’—দিনটিকে তিনি দলের জন্য একটি ‘চমৎকার দিন’ বলে উল্লেখ করেন।

দীর্ঘদিন ধরেই দলের ব্যানারে খালেদা জিয়ার পাশে তারেক রহমানের ছবি ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যা তাকে নেতৃত্বের উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করার ইঙ্গিত দেয়।

জুন মাসে তিনি লন্ডনে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইউনূস আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা করছেন।

রাজনীতির উত্তরাধিকার

তারেক রহমান ১৯৬৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন, তখন বাংলাদেশও জন্মায়নি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাথমিক শৈশবে স্বল্প সময়ের জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক পড়েন তিনি—বিএনপি তাকে ‘কনিষ্ঠ যুদ্ধবন্দীদের একজন’ বলে উল্লেখ করে থাকে।

তার বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনা কর্মকর্তা, যিনি ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসেন। একই বছর বাংলাদেশে আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে—সে ঘটনায় শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন।

জানা যায়, এই ঘটনাই জিয়া ও শেখ পরিবারের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈরিতার সূচনা করে, যা ‘বেগমদের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।

তারেক রহমানের বয়স ১৫ বছর থাকতেই তার বাবা নিহত হন। এরপর তিনি তার মায়ের রাজনৈতিক ছায়াতেই বেড়ে ওঠেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা পর্যায়ক্রমে একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির তথ্যমতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্বল্প সময় পড়াশোনা করার পর ২৩ বছর বয়সে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরোধিতায় বিএনপিতে যুক্ত হন।

২০০৬ সালে প্রকাশিত এক মার্কিন দূতাবাসের কূটনৈতিক বার্তায় তাকে বিএনপির ‘উদীয়মান উত্তরাধিকারী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যিনি রাজনীতিতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

২০০৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরই মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান এবং এরপর আর দেশে ফেরেননি।

ব্রিটেনে অবস্থানকালে তিনি তার স্ত্রী—একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ—ও কন্যার সঙ্গে বসবাস করেন।

শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং বিএনপি সমর্থকদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর ও সংগঠকের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন।