ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৯ দিন বাকি। নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বেশ জোরেশোরেই মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত নানা জনসভায় নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু কী আছে বিএনপির এই ফ্যামিলি কার্ডে? কী কী সুবিধা পাবেন নাগরিকরা? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ এর আগেও এমন সাহসী উদ্যোগ দেখেছে। ১৯৯২-৯৩ সালে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি চালু হয়েছিল। সেই উদ্যোগ শিক্ষার সঙ্গে খাদ্যকে যুক্ত করে লাখো শিশুকে, বিশেষ করে মেয়েদের স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিল। আজ ফ্যামিলি কার্ড সেই ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ। তখন শিক্ষায় কন্যাশিশুকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল, আজ খাদ্যনিরাপত্তা ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি।
বিশ্বের নানা দেশে গবেষণায় প্রমাণিত—নারীর হাতে সরাসরি সহায়তা দিলে তার সুফল শুধু নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পৌঁছে যায় সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের পুষ্টি এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায়। নারী সহায়তা পেলে তা অপচয় হয় না; বরং ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হয়। ফ্যামিলি কার্ড কোনো দয়ার কর্মসূচি নয়। এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান, যা নারীকে করুণার বস্তু নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে।
আজকের কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ড একটি বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ ও সাহসী পথনির্দেশনা। এটি নারীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, পরিবারকে শক্ত করে এবং রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির প্রস্তাব আসছে, যেখানে নারীর ক্ষমতায়নই হবে আত্মনির্ভরশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের ভিত্তি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম ফ্যামিলি কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে আমাদের নারীরা নিরাপত্তা পাবে এবং স্বাবলম্বী হয়ে পরিবার তথা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে। ফ্যামিলি কার্ড ছাড়াও পরিবারের পুরুষ সদস্য, সন্তানের সুষ্ঠু বিকাশ, তাদের বেড়ে ওঠা এবং বিপথগামী হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য সর্বমোট আটটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি পরিবারকে মাসিক দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা অথবা সমপরিমাণ খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই সহায়তা কেবল ভাতা হিসেবে নয়, বরং পরিবারকে ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা দিয়ে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি উপায়। নিয়মিত সহায়তা পেলে দরিদ্র পরিবারগুলো সন্তানদের শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা বা আয়বর্ধক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে সহায়ক হবে।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো কার্ডটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করার পরিকল্পনা। এতে নারীর আর্থিক ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা বাড়বে। গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে নারীরা অনেক সময় পরিবারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পান না। এই উদ্যোগ নারীদের সেই ভূমিকা আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে, ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তার কয়েক দশকের সুবিস্তৃত, সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত পলিসিগুলো বাস্তবায়ন করবেন। তিনি নিশ্চিত করবেন একটি জবাবদিহিমূলক, দায়বদ্ধ ও স্বচ্ছ সরকার। সেই সরকার কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করবে যে জনগণই রাষ্ট্রের সত্যিকারের মালিক, জনগণই বিএনপির রাজনৈতিক শক্তি।
সম্প্রতি বিএনপির অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত এক পডকাস্টে তারেক রহমান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কার্ডটি দেশের কোটি কোটি মা-বোনের হাতে তুলে দেওয়া হবে। কার্ডটিতে থাকবে গৃহকর্ত্রীর নাম, একটি ইউনিক নম্বর, মেয়াদ ও স্ক্যানযোগ্য চিহ্ন, যা পরিবারভিত্তিক সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, ‘চার কোটি পরিবারকে ধাপে ধাপে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে ধীরে ধীরে সব পরিবারের কাছে পৌঁছানোর। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবার মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা পাবে, যা নগদ অথবা প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য ব্যবহার করা যাবে। এই সহায়তার ফলে পরিবারগুলো টাকা সঞ্চয় করতে পারবে। সেই সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় ব্যয় করা যাবে। গ্রামীণ নারীরা প্রয়োজনে এই অর্থ ক্ষুদ্র বিনিয়োগেও ব্যবহার করতে পারবেন, যা পরিবারে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশে আনুমানিক চার কোটি পরিবার রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রামে এবং ৩০ শতাংশ শহরে বসবাস করে। আমরা পরিবারভিত্তিকভাবে কাজ শুরু করব। প্রথমে গ্রাম থেকে, পরে শহরের দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত এলাকাগুলোতে কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি বলেন, এই কার্ড গৃহকর্ত্রীর নামে ইস্যু করা হবে। একজন কৃষকের স্ত্রী যেমন এই কার্ড পাবেন, তেমনি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের স্ত্রীও পাবেন। ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এমনকি সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীও এই কার্ড পাবেন। তবে যাদের প্রয়োজন নেই, তারা কার্ড ফিরিয়ে দেবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।



