ইসলামী জীবনদর্শনে মহান আল্লাহর ইবাদতের পরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণকে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশের সাথে সাথেই পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে বার্ধক্যে তাঁদের সেবা করাকে পরকালীন মুক্তির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইহকালে পিতা-মাতার সেবার গুরুত্ব ও প্রভাব
পিতা-মাতার দোয়া বা বদদোয়া মানুষের ইহকালীন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ইসলাম অনুসারে এর মূল্যায়ন নিম্নরূপ:
রিজিকে বরকত ও দীর্ঘায়ু: রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তার আয়-উপার্জনে বরকত এবং দীর্ঘ আয়ু কামনা করে, সে যেন পিতা-মাতার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে এবং তাঁদের সেবা করে।
বিপদ থেকে মুক্তি: বিখ্যাত ‘তিন ব্যক্তির গুহায় আটকে পড়া’র ঘটনায় দেখা যায়, এক ব্যক্তি কেবল পিতা-মাতার সেবার উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করায় অলৌকিকভাবে বিপদ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।
দোয়া কবুলের নিশ্চয়তা: নবীজি (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া সরাসরি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া।
পরকালে পিতা-মাতার সেবার মূল্যায়ন
পরকালীন জীবনে জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা অনেকাংশেই পিতা-মাতার সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করে:
জান্নাতের দরজা: রাসুল (সা.) বলেছেন, “পিতা জান্নাতের মধ্যম দরজা।” অর্থাৎ, পিতাকে সন্তুষ্ট রাখার মাধ্যমেই জান্নাতে প্রবেশ সহজ হয়। অন্য এক হাদিসে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত ঘোষণা করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় গুনাহ: আল্লাহর সাথে শিরক করার পরেই সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ হলো পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়া বা তাঁদের অবাধ্য হওয়া। এর শাস্তি পরকালের পাশাপাশি দুনিয়াতেও পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হজ ও জিহাদের সওয়াব: এক ব্যক্তি জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে নবীজি (সা.) তাকে বাড়িতে গিয়ে বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা করার নির্দেশ দেন এবং বলেন এটাই তার জন্য জিহাদ।
বৃদ্ধ বয়সে খেদমত: ইসলামের বিশেষ তাগিদ
পিতা-মাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন, তখন তাঁদের মেজাজ খিটখিটে হতে পারে বা তাঁরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: “তাদের মধ্যে একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
পিতা-মাতার খেদমত কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যারা তাঁদের সেবা করার সুযোগ পেয়েও জান্নাত নিশ্চিত করতে পারল না, তাদের জন্য হাদিসে আফসোস করা হয়েছে। তাই ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জনই হোক আমাদের লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: সূরা বনী ইসরাঈল, বুখারি ও মুসলিম শরিফ।


