ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

কম সুদের ঋণের প্রলোভন: দুর্দশাগ্রস্ত শিল্পগোষ্ঠীকে টার্গেট প্রতারক চক্রের

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
এআই তৈরি ছবি।

দেশের আর্থিক সংকটে থাকা বৃহৎ ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন ধরনের একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কম সুদে ৫০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা, এমনকি তারও বেশি অঙ্কের ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এই চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারকরা নিজেদেরকে প্রভাবশালী ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা বিদেশি ব‍্যাংকের প্রতিনিধি অথবা বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিকদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের দাবি, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে থাকা বিপুল অঘোষিত অর্থ কম সুদে বিনিয়োগ করা হবে। এজন্য কোনো ব্যাংক গ্যারান্টি, বন্ধক বা প্রচলিত জামানতের প্রয়োজন হবে না। শুধুমাত্র একটি চুক্তিপত্র (ডিড) এবং কয়েকটি স্বাক্ষরিত চেকই হবে জামানত।

প্রথমে বিশ্বাস, পরে শুরু অর্থ আদায়

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে প্রতারকরা বারবার আশ্বস্ত করে যে কোনো অগ্রিম অর্থ লাগবে না। কেবল একটি আইনি চুক্তি সম্পাদন করতে হবে এবং কয়েকটি চেকের নম্বর ও কপি দিতে হবে।

ডিড সম্পন্ন হওয়ার পরই শুরু হয় অর্থ আদায়ের ধাপ। প্রথমে বলা হয়, ‘ফাইল ওপেনিং’ বা ‘ডকুমেন্ট প্রসেসিং’-এর জন্য ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা প্রয়োজন। ৫০০ বা ১,০০০ কোটি টাকার বিপরীতে এই অর্থকে খুবই সামান্য বলে উপস্থাপন করা হয়। এমনকি সেই টাকার বিপরীতে একটি কাউন্টার চেকও দেওয়া হয় এবং লিখিতভাবে উল্লেখ করা হয়, ঋণ কার্যকর না হলে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এতেই ভুক্তভোগীদের আস্থা আরও বেড়ে যায়।

কিন্তু এরপর একের পর এক নতুন অজুহাতে অর্থ দাবি করা শুরু হয়। কখনও বলা হয় নগদ টাকা বহনের জন্য বিশেষ বস্তা কিনতে হবে। কখনও ট্রাক ভাড়ার টাকা, কখনও নিরাপত্তা ব্যয়, আবার কখনও দাবি করা হয় টাকা বহনকারী গাড়িতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি অর্থ প্রয়োজন।

প্রতিবারই দাবি করা হয় তুলনামূলক ছোট অঙ্ক, দুই লাখ, তিন লাখ বা পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু ধাপে ধাপে সেই অঙ্ক কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।

টাকা বন্ধ করলেই উধাও পুরো নেটওয়ার্ক

একপর্যায়ে যখন ব্যবসায়ী বুঝতে পারেন যে ঋণের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই এবং আর অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তখনই প্রতারক চক্রটির সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। যে অফিসে এতদিন বৈঠক হয়েছে, সেটি খালি পাওয়া যায়। ভিজিটিং কার্ড, পরিচয়পত্র, প্রতিষ্ঠানের নাম, এমনকি অফিসের ঠিকানাও ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়।

তদন্তে আরও জানা গেছে, জামানত হিসেবে দেওয়া কাউন্টার চেকগুলোর বেশিরভাগই অন্যের হারানো চেক, চুরি হওয়া চেকবইয়ের পাতা অথবা জাল চেক। ফলে সেগুলোর মাধ্যমে অর্থ আদায় কিংবা আইনি প্রতিকার পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কেন অনেক ভুক্তভোগী আইনি ব্যবস্থা নেন না

আর্থিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতারণার সবচেয়ে কৌশলী দিক হলো অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের গল্প।

প্রতারকরা দাবি করে, পতিত রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী আমলা কিংবা বিভিন্ন ব্যক্তির অবৈধ নগদ অর্থ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা কম সুদে বিনিয়োগ করে বৈধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বক্তব্যে সম্মত হয়ে ব্যবসায়ীরা যখন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, তখন পরবর্তীতে অনেকেই আইনগত ব্যবস্থা নিতে ভয় পান। কারণ অভিযোগ করলে নিজেরাও অবৈধ অর্থ গ্রহণের চেষ্টার বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করেন। এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকেই মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে প্রতারক চক্র।

রয়েছে বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি সুসংগঠিত বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক। প্রথম স্তরের সদস্যরা আর্থিক সংকটে থাকা ব্যবসায়ী বা শিল্পগোষ্ঠী খুঁজে বের করে। এরপর তারা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা উপদেষ্টাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সফল লেনদেন হলে মোটা অঙ্কের কমিশনের প্রলোভন দেয়। পরবর্তী ধাপে ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় তথাকথিত অর্থদাতার প্রতিনিধির।

তিনি কখনও বিলাসবহুল গাড়িতে আগমন করেন, দামি ঘড়ি ও মোবাইল ব্যবহার করেন, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়ীর ভাবমূর্তি তৈরি করেন। আবার কখনও ধর্মীয় ভাবমূর্তি ধারণ করে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে বৈঠকে আসেন এবং আজানের পরপরই সবাইকে নিয়ে নামাজ আদায়ের আহ্বান জানান।

ভুক্তভোগীদের দাবি, বৈঠকের আগে প্রতারকরা গোপনে ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত অভ্যাস, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর সেই অনুযায়ী নিজেদের উপস্থাপন করে দ্রুত বিশ্বাস অর্জন করে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ

চট্টগ্রামভিত্তিক এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৭০ লাখ টাকা নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার একটি সুপরিচিত শিল্পগোষ্ঠীর এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ফাইল খোলা, সম্পদের মূল্যায়ন (Asset Valuation), করপোরেট প্রোফাইল প্রস্তুতসহ বিভিন্ন অজুহাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার পর পুরো চক্রটি আত্মগোপনে চলে গেছে।

আরেক ব্যবসায়ী গ্রুপের দাবি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সুবিধা হিসেবে স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (SBLC) সংগ্রহের নামে বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলে প্রায় ৩০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো সেবা পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্টদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি শত শত কোটি টাকা কোনো ধরনের ব্যাংকিং প্রক্রিয়া, যথাযথ যাচাই-বাছাই কিংবা বৈধ জামানত ছাড়া ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তবে সেটিকে অত্যন্ত সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তাদের মতে, যাদের কাছে অবৈধ অর্থ রয়েছে, তারা সাধারণত আইনগত ঝুঁকি এড়িয়ে সেই অর্থ গোপনে অবৈধ পন্থায় বিদেশে স্থানান্তরের করতে নিতে পারে। শুধুমাত্র একটি ডিড ও কয়েকটি চেকের ভিত্তিতে শত শত কোটি টাকা কোনো ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়ার দাবি বাস্তবসম্মত নয়।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, যদি চেকই একমাত্র জামানত হয়, তবে অবৈধ অর্থের কথিত মালিক সেই চেক নিয়ে আদালতে গেলেই প্রথম প্রশ্ন উঠবে, এত বিপুল অর্থের উৎস কী। ফলে পুরো দাবিটিই বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তাদের আহ্বান, কম সুদে অস্বাভাবিক অঙ্কের ঋণ, অবৈধ অর্থ বিনিয়োগ, বিদেশি তহবিল বা SBLC-এর নামে কোনো প্রস্তাব এলে অর্থ লেনদেনের আগে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, আইনজীবী এবং আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে হবে। অন্যথায় এমন সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীগুলো কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।