ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুত সক্ষমতা কোন পথে

আসাদুজ্জামান তপন
প্রকাশিত: মার্চ ৩১, ২০২৬, ০২:১১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন প্রতিটি দেশের জন্য কৌশলগত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ অনেক দেশ তাদের জ্বালানির মজুত সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।

কিন্তু এর বিপরীতে বাংলাদেশে ৫৫ বছরেও বাড়ানো যায়নি জ্বালানির তেলের মজুত সক্ষমতা। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগও কোনো সরকারের আমলে পরিলক্ষিত হয়নি।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি বা সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক চাপের মুখে পড়তে হয় এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়ানোকে এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উল্লিখিত দেশগুলো সাধারণত ৯০ দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও তেল মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, যাতে সংকটের সময় অর্থনীতি ও পরিবহন ব্যবস্থা স্থবির না হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি SPR সবচেয়ে বড়, যেখানে প্রায় ৭০০ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে, যা সংকটকালে কয়েক মাস দেশটির চাহিদা মেটাতে পারে। চীন সরকারি ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত মজুত সক্ষমতা তৈরি করেছে। জাপান ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ব্যারেল ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সাধারণত ৯০ দিনের আমদানি চাহিদা পূরণের মতো তেল মজুত সক্ষমতা রয়েছে। আর ভারত বর্তমানে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ব্যারেল কৌশলগত মজুত-সক্ষমতা রয়েছে।

অন্যদিকে বিপিসির দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা প্রায় সোয়া ১১ লাখ টন, যার মধ্যে পরিশোধিত তেল—ডিজেল ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন, অকটেন ৫৩ হাজার ৬১৬ টন, পেট্রোল ৩৭ হাজার ১৩ টন, ফার্নেস অয়েল ১ লাখ ৪৪ হাজার টন, জেট ফুয়েল ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন। বাকি ২ লাখ ২৫ হাজার টন অপরিশোধিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বড় কোনো উন্নত কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ ব্যবস্থা নেই। তুলনামূলক এই সীমিত মজুতের কারণে বাংলাদেশ নানা ইস্যুতে জ্বালানি তেল নিয়ে বারংবার হোঁচট খাচ্ছে।

মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য নির্মিত এসপিএম (Single Point Mooring) প্রকল্পে দেড় লাখ টন অপরিশোধিত তেল এবং ৭৫ হাজার টন পরিশোধিত তেল সংরক্ষণের সুবিধা রাখা হয়েছে। এই অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলেও অপারেটর নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে গত দুই বছর ধরে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় সোয়া দুই লাখ টন মজুত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা এখনো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারত। কারণ, এটি একদিকে আমদানিনির্ভরতা কমাত, অন্যদিকে তেল পরিবহনের সময় ও খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করত। কিন্তু প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-টু (ERL Unit-2) নির্মাণ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যমান পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেত। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ টন মজুত সক্ষমতা থাকলেও নতুন ইউনিট যুক্ত হলে তা বহুগুণে সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে গত প্রায় ১৬ বছর ধরে প্রকল্পটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জটিলতায় আটকে থাকায় এর অগ্রগতি থমকে আছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সদস্য অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা যেকোনো জাতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেল মজুত সক্ষমতা নিয়ে কোনো সরকারই আজ পর্যন্ত সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতকে পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে মুনাফাভিত্তিক খাতে পরিণত করা হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেলের কৌশলগত মজুত বা সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার যেকোনো উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কিংবা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, বাস্তবায়ন জটিলতা ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কেউ সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে এসপিএম প্রকল্প ও ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-টু-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা এবং মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিলম্ব নিয়ে সরকারি পর্যায়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।