ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

ধুমঘাট ফরেস্ট স্টেশন শামীমের টোল প্লাজা

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ১২:০২ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ধুমঘাট ফরেস্ট চেক স্টেশন। কাগজে-কলমে যার কাজ বনজ সম্পদ পরিবহন, তদারকি ও অবৈধ কাঠ পাচার ঠেকানো। কিন্তু কাঠ ব্যবসায়ী, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, বাস্তবে এই চেক স্টেশন পরিণত হয়েছে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘টোল প্লাজা’য়। বৈধ-অবৈধ সব ধরনের কাঠবাহী গাড়িকেই এখানে থামতে হয়। অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলেও নির্ধারিত অঙ্কের উৎকোচ না দিলে হয়রানি, মামলা কিংবা গাড়ি আটকে রাখার আশঙ্কায় থাকেন চালক ও ব্যবসায়ীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ধুমঘাট ফরেস্ট চেক স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) শামীম রেজা। ব্যবসায়ীদের দাবি, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, লামা, আলীকদম ও কক্সবাজার থেকে আসা গোল কাঠ, জ্বালানি কাঠ, রদ্দা কাঠ ও আসবাবপত্রবাহী গাড়ির একটি বড় অংশ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায় করা হয়। ফলে বনজ পণ্য পরিবহনকে ঘিরে এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। দাবি পূরণ না হলে বন আইনে মামলা দেওয়া, দীর্ঘ সময় গাড়ি আটকে রাখা কিংবা নথিপত্রে নানা ত্রুটি দেখানো হয়। 

খাগড়াছড়ির কাঠ ব্যবসায়ী শওকত হোসেন খোকা বলেন, কাগজপত্র ঠিক থাকলেও চাহিদামতো টাকা না দিলে বৈধ কাঠকেও অবৈধ বানানোর চেষ্টা করা হয়। এতে ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরু সওদাগরের অভিযোগ, এই কার্যক্রমে মাঠ পর্যায়ে ফরেস্ট গার্ড নাসির চৌধুরী ও আঙ্গুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের মাধ্যমেই অধিকাংশ অর্থ লেনদেন ও তদারকি হয় বলে দাবি করেন তিনি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ধুমঘাট চেক স্টেশনের ফরেস্ট গার্ড নাসির চৌধুরীর পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বন বিভাগের প্রচলিত বদলিনীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে তাকে এখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

শুধু বর্তমান দায়িত্বস্থল নয়, শামীম রেজার আগের কর্মস্থল নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসনাবাদ রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে বনভূমি দখলে সহায়তা এবং সরকারি ‘সুফল’ প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরে বিভাগীয় তদন্তের মুখে তাকে ওই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এরও আগে বান্দরবানের তারাছা রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে সংরক্ষিত বনভূমি থেকে অবৈধভাবে কাঠ উত্তোলন, জোট পারমিট ইস্যু এবং বনভূমি দখলে সহায়তার অভিযোগও রয়েছে শামীমের বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডেপুটি রেঞ্জার শামীম রেজার মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি  গাড়িতে আছেন বলে ফোনটি রেখে দেন। একই বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে ধুমঘাট ফরেস্ট চেক স্টেশনের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। তাদের ভাষ্য, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যদি এমন অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু বন বিভাগের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করবে না, বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জনআস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান সংশ্লিষ্টরা।