ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বৈধ প্রক্রিয়ার আড়ালে অবৈধ স্মার্টফোন

শাওন সোলায়মান
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬, ১২:০৬ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

চীনভিত্তিক স্মার্টফোন ব্র্যান্ড ‘ওয়ানপ্লাস’-এর আনুষ্ঠানিক (অফিসিয়াল) কার্যক্রম রয়েছে বাংলাদেশে। তবুও অনানুষ্ঠানিক (আন-অফিসিয়াল) উপায়ে বাংলাদেশে স্মার্টফোন আনছে ওয়ানপ্লাস। অর্থাৎ, অফিসিয়াল ওয়ানপ্লাসই নিজের স্মার্টফোন আন-অফিসিয়াল চ্যানেলে বাংলাদেশে আনে। তারপর সেগুলোকে ‘অফিসিয়াল’ ঘোষণা দিয়ে আন-অফিসিয়ালের তুলনায় অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এমন নেটওয়ার্ক চালাচ্ছে ওয়ানপ্লাস। এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। 

২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশে সংযোজিত ‘লো অ্যান্ড মিড রেঞ্জ’-এর স্মার্টফোন নিয়ে দেশের বাজারে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ওয়ানপ্লাস। এর আগে প্রায় পাঁচ বছর স্থানীয় সরবরাহকারীদের মাধ্যমে দেশে আসা ওয়ানপ্লাস ব্র্যান্ডের ডিভাইস কিনতে হতো গ্রাহকদের। তবে লো অ্যান্ড মিড রেঞ্জের বাইরে ফ্ল্যাগশিপ মডেলের চাহিদা এখনো আমদানি করেই মেটাচ্ছে ওয়ানপ্লাস। বাংলাদেশে ওয়ানপ্লাসের সরাসরি ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম থাকায় মোবাইল ক্রেতারা সবধরনের মডেলই ‘অফিসিয়াল’ ভেবে কিনে থাকেন। আবার এগুলোর সঙ্গে বিক্রয়োত্তর সেবা থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে সন্দেহও দানা বাঁধে না। তবে রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে, তুলনামূলক দামি এবং ফ্ল্যাগশিপ মডেলের ওয়ানপ্লাস ডিভাইস প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমেই দেশে আন-অফিসিয়াল উপায়ে আনার সত্যতা উঠে আসে। 

বিটিআরসি আরোপিত নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাজারজাত করলে দেশে বা বিদেশে উৎপাদিত সবধরনের মোবাইল হ্যান্ডসেটের বাক্সে বিটিআরসি প্রদত্ত বিশেষ বার্তা সংবলিত ‘স্টিকার’ বা ‘সিল’ থাকতে হয়। বিটিআরসি নির্ধারিত ওই বার্তাটি হলো ‘মোবাইল হ্যান্ডসেট ক্রয়ের পূর্বে KYD 15 ডিজিটের IMEI নম্বর লিখে ১৬০০২-তে এসএমএস করে IMEI-এর সঠিকতা যাচাই করে নিন- বিটিআরসি’। অর্থাৎ ডিভাইসটির আইএমইআই তথ্য বিটিআরসি ডাটাবেইজে থাকার বিষয়টি গ্রাহককে নিশ্চিত করতেই এই তথ্যবার্তা বাধ্যতামূলক করে বিটিআরসি। বাংলাদেশে মোবাইল ফোন আমদানি ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই স্টিকারটি সব ধরনের (বাংলাদেশে বা বাংলাদেশের বাইরে উৎপাদিত) হ্যান্ডসেটের জন্য বাধ্যতামূলক। স্মার্টফোন বিদেশে উৎপাদিত হলেও উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সেই স্টিকার বা সিল মোবাইলের বাক্সে যুক্ত করে তবেই প্যাকেজিং করেন। ধরুন চীনের কোনো ব্র্যান্ড বাংলাদেশের জন্য যে ডিভাইস বানাবে তার বাক্সে ওই সিল দিয়ে তবেই প্যাকেজিং করবে। একই ডিভাইস অন্য কোনো দেশের বা অঞ্চলের জন্য বাজারজাত করলে সিলটি দেবে না। কাজেই কোনো ব্র্যান্ডের বাক্সের গায়ে বিটিআরসির বার্তা সংবলিত ওই সিল না থাকার অর্থ হচ্ছে, ডিভাইসটি বাংলাদেশের বাজারকে লক্ষ্য করে বানানোই হয়নি। সম্ভাবনা আছে যে, ডিভাইসটি অনানুষ্ঠানিক উপায়ে বাংলাদেশে আনা হয়েছে, নইলে সেখানে সিল থাকত।’

গত শুক্রবার রাজধানীতে ওয়ানপ্লাসের একাধিক অফিসিয়াল দোকানে ক্রেতার ছদ্মবেশে হ্যান্ডসেটের বাক্সে ওই সিল খুঁজেছেন এই প্রতিবেদক। সাধারণত গড়ে ৫০ হাজার টাকার মধ্যের কিছু হ্যান্ডসেটের বাক্সে ওই সিল দেখা গেছে। তবে কোনো ফ্ল্যাগশিপ বা দামি মডেলের বাক্সে (যেমন- প্রায় এক লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের ওয়ানপ্লাস ১৫) বিটিআরসির বার্তা সংবলিত সিলটি ছিল না।

অন্যদিকে প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের ‘ওয়ানপ্লাস ১৩’ এবং ‘ওয়ানপ্লাস ১৩আর’ মডেলের একাধিক চালানের তথ্য রয়েছে রূপালী বাংলাদেশের কাছে। গত বছরের প্রথমার্ধে বাজারজাত করা ওই ডিভাইসগুলো অনানুষ্ঠানিক উপায়ে বাংলাদেশে এনেছে ওয়ানপ্লাস। এ-ধরনের হ্যান্ডসেট আমদানি করা একটি সূত্র পরিচয় গোপনের শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে এই তথ্য নিশ্চিত করে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘ওয়ানপ্লাস ১৩, মডেল নম্বর-সিপিএইচ২৬৫৩, এসকিইউ : ৫০১১১১১১০৭৬, আইএমইআই নম্বর-৮৬২৬৯০৭১৩৫৭৯৩৬’ পরিচয়বহনকারী ডিভাইসটি বাংলাদেশে বাজারজাত করা হয়েছে এবং ক্রেতাদের কাছে অফিসিয়াল হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। এমন আরও প্রায় দুই ডজন ডিভাইসের তথ্য রয়েছে রূপালী বাংলাদেশের কাছে। 

খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে মোবাইল ফোন বিক্রি করেন এমন একাধিক ব্যবসায়ী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, গত বছর ১২ গিগাবিট (জিবি) র‌্যাম এবং ২৫৬ জিবি র‌্যামের ওয়ানপ্লাস ১৩ মডেলের স্মার্টফোনটি গ্রাহকদের কাছে অফিসিয়াল হিসেবে এক লাখ ১০ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। আন-অফিসিয়াল হিসেবে একই ডিভাইসটির মূল্য ছিল প্রায় এক লাখ টাকা। অর্থাৎ আন-অফিসিয়াল উপায়ে দেশে আনা স্মার্টফোন অফিসিয়াল পরিচয়ে বিক্রিতে ডিভাইসপ্রতি ওয়ানপ্লাসের অতিরিক্ত মুনাফা হয়েছে অন্তত ১০ হাজার টাকা। হ্যান্ডসেট আমদানি করা ওই সূত্রটি বলছে, ‘কোনো হ্যান্ডসেট বাংলাদেশে অফিসিয়ালি আনার আগে বিটিআরসিতে অন্তত এক ডজন ডকুমেন্টের সঙ্গে নমুনা কপি দিয়ে অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি পাওয়া গেলে অফিসিয়াল উপায়ে আনা হ্যান্ডসেটের সঙ্গে ক্রয় আদেশ (পিও), এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) ডকুমেন্ট, বিল অব এন্ট্রির মতো আরও কিছু ডকুমেন্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মতো সংস্থার কাছে দিতে হয়। আরও দিতে হয় আমদানি শুল্কসহ প্রযোজ্য অন্যান্য কর। তবে আন-অফিসিয়াল হ্যান্ডসেটে এগুলোর বালাই নেই।’ সূত্রটি আরও বলছে, ‘ওয়ানপ্লাসের আগের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিটিআরসি থেকে আমদানির অনুমতি নিয়েছিল ওয়ানপ্লাস। তবে উচ্চদামের ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইস অফিসিয়াল উপায়ের তুলনায় বহুগুণে আন-অফিসিয়াল উপায়ে এনেছিল ওয়ানপ্লাস। ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইসের ক্ষেত্রে অফিসিয়ালের সঙ্গে আনুমানিক ১:৯ অনুপাতে আন-অফিসিয়াল হ্যান্ডসেট আনে চীনা এই ব্র্যান্ড। অর্থাৎ শুল্ক প্রদানসাপেক্ষে অফিসিয়াল উপায়ে আনা শতকরা ১০টি মোবাইলের সঙ্গে ৯০টি মোবাইল ফোন আমদানি শুল্কবিহীন আন-অফিসিয়াল উপায়ে এনে বাজারজাত করেছে ওয়ানপ্লাস।’ বাংলাদেশে ওয়ানপ্লাসের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম থাকায়, ডিভাইসগুলো আনুষ্ঠানিক ও অনুমোদিত বিক্রেতার মাধ্যমে বিক্রি করায় এবং নিজেদের ব্যবস্থায় বিক্রয়োত্তর সেবা দেওয়ায়, ওয়ানপ্লাসের এই প্রতারণা এতদিন আড়ালেই ছিল।  

ডিভাইস হ্যান্ডসেট আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অসাধু কর্মকর্তাদের একটি পক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই র‌্যাকেট চালাচ্ছে ওয়ানপ্লাস। 

এসব বিষয়ে ওয়ানপ্লাসের বক্তব্য জানতে গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধির সঙ্গে গত সোমবার যোগাযোগ করা হয় রূপালী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। রূপালী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইমেইলে লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে চাইলেও ওয়ানপ্লাস অথবা ওই প্রতিনিধির অফিসিয়াল ইমেইল ঠিকানা দিতে অপারগতা জানান তিনি। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত প্রশ্নের জবাবে আন-অফিসিয়াল হ্যান্ডসেট আমদানির অভিযোগ অস্বীকার করে ওয়ানপ্লাসের পক্ষে ওই প্রতিনিধি জানান, ‘অনুমোদিত অংশীদারভিত্তিক দোকানের মাধ্যমে আমাদের পণ্য বাজারজাত হয়। অফিসিয়াল পলিসির বাইরে গিয়ে কোনো একক বিক্রেতা কোনো অনিয়ম করে থাকলে, এমন বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখি এবং তদন্ত করি। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্যবিহীন (আইএমইআই নম্বর, দোকানের নাম, অবস্থা) কোনো অভিযোগ যাচাই করতে পারি না।’ এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে উপরে উল্লিখিত ডিভাইসের তথ্য জানিয়ে ওই ডিভাইস আমদানি-সংশ্লিষ্ট দলিল দেখানোর চ্যালেঞ্জ করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে জেনে প্রতিবেদককে অবহিত করবেন বলে জানান ওয়ানপ্লাসের ওই প্রতিনিধি। এরপর এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কয়েক দফা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এ বিষয়ে ওয়ানপ্লাসের বৈশ্বিক ওয়েবসাইটে উল্লিখিত গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া ইমেইলেও প্রশ্ন পাঠান প্রতিবেদক। নিজের পরিচয়-সংক্রান্ত দলিল সংযুক্ত করে অফিসিয়াল ঠিকানা থেকে দেওয়া সেই ইমেইলেরও কোনো সাড়া মেলেনি এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত।