গত সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ম্যানচেস্টার সিটি বস পেপ গার্দিওলা হাসিমুখে বলেছিলেন, তুমি কি আমার সহকারী কোচ হতে চাও? তুমি তো দুর্দান্ত, একদম টপ লেভেলের!
গার্দিওলাকে এই প্রশংসায় ভাসাতে বাধ্য করেছিলেন সেই সাংবাদিকের একটি গভীর পর্যবেক্ষণ। প্রশ্নটি ছিল ম্যানচেস্টার সিটির বর্তমান ‘ন্যারো’ বা সংকীর্ণ এবং ‘ফ্লুইড’ (অস্থিতিশীল) আক্রমণভাগ নিয়ে। ২০১৭-১৮ মৌসুমের সেই সিটির কথা মনে আছে? যেখানে লেরয় সানে বা রাহিম স্টার্লিংরা একদম টাচলাইনের ধারে ঘাসে লেগে থাকা সাদা চুন বুটে মেখে খেলতেন। অর্থাৎ, উইঙ্গাররা থাকতেন একদম সাইডলাইনে। কিন্তু এক দশক পর গার্দিওলার সিটি এখন খেলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচে।
এই পরিবর্তনের রহস্য লুকিয়ে আছে ২০০৬ সালে স্প্যানিশ পত্রিকা এল পাইস-এ গার্দিওলার লেখা একটি কলামে। সেখানে তিনি তিউনিসিয়ার বিপক্ষে স্পেনের ৩-১ গোলের জয়ের বিশ্লেষণ করেছিলেন। ২০ বছর আগে লেখা সেই কলামে গার্দিওলা ব্যাখ্যা করেছিলেন কীভাবে প্রতিপক্ষের ‘লো-ব্লক’ বা জমাট রক্ষণ ভাঙতে হয়।
চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো যখন সিটির বিপক্ষে রক্ষণাত্মক দেয়াল তুলে ধরছে, তখন গার্দিওলা ফিরে গেছেন তার সেই পুরোনো তত্ত্বে। মৌসুমের শুরুতে আর্লিং হালান্দ বা তিজানি রেইন্ডারসদের গতি ব্যবহার করে কাউন্টার অ্যাটাকে প্রচুর গোল করলেও, সম্প্রতি সিটি কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে।
গার্দিওলার মতে, সরাসরি বা খুব দ্রুত আক্রমণ করতে গেলে বল হারানোর ঝুঁকি বাড়ে। আর মাঝমাঠে বল হারালে দল অগোছালো হয়ে পড়ে, যা প্রতিপক্ষকে সুযোগ করে দেয়। গার্দিওলার ভাষায়, প্রক্রিয়াটি যদি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা যায়, তবে ফাঁকা জায়গা সবসময়ই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

ফুলহামের বিপক্ষে সিটির সাম্প্রতিক ৩-০ গোলের জয়টি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে হ্যালান্দ এবং আন্টোয়ান সেমেনিও ‘স্প্লিট স্ট্রাইকার’ হিসেবে খেলছিলেন, আর তাদের পেছনে ছিলেন ফিল ফোডেন।
এই কাঠামোটি ২০০৬ সালের লুইস আরাগোনেসের সেই স্পেন দলের কথা মনে করিয়ে দেয়, যারা ‘টিকি-টাকা’র জন্য পরিচিত ছিল। গার্দিওলা স্পেনের সেই ফরোয়ার্ডদের বলেছিলেন ‘পজিশন-লেস’ বা নির্দিষ্ট অবস্থানহীন। আজকের সিটিতেও ফোডেন বা সেমেনিওরা একইভাবে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করছেন।
গার্দিওলা এখন ফরোয়ার্ডদের মাঝমাঠের দিকে টেনে আনছেন যাতে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররাও তাদের পিছু পিছু ওপরে উঠে আসে। এতে করে দুই প্রান্ত দিয়ে মাথেউস নুনস বা রায়ান আইত-নুরির মতো ফুলব্যাকদের জন্য জায়গা তৈরি হচ্ছে।
তবে এখানে মূল চাবিকাঠি হলো ‘টাইমিং’। গার্দিওলা চান তার খেলোয়াড়রা যেন খুব দ্রুত নিচে নেমে না আসেন, বরং সঠিক সময়ে নিচে নেমে এসে প্রতিপক্ষের মিডফিল্ডারদের পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি করেন।
অর্থাৎ, গার্দিওলা কেবল তার তত্ত্বে অনড় নন, বরং তার হাতে থাকা ফুটবলারদের সেরাটুকু বের করে নিতে তিনি কৌশলে পরিবর্তন আনেন। ২০ বছর আগে তিনি যে ফুটবলীয় দর্শনের কথা লিখেছিলেন, ২০২৬ সালে এসেও ম্যানচেস্টার সিটির ডাগআউটে বসে সেই একই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন এই মাস্টারমাইন্ড।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন