কাঠমান্ডু, ১৭ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ উদযাপন করেছে কাঠমান্ডুস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাস প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি উৎসবমুখর পরিবেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধান, নেপাল সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাবৃন্দ, কূটনীতিক, বিশিষ্ট নেপালি ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং নেপালে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি ও তাদের পরিবারবর্গ অংশগ্রহণ করেন। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সার্কের মহাসচিব। ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব ও মিশরসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজনটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মাত্রা লাভ করে।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত পহেলা বৈশাখের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই উৎসব আজ বাংলাদেশের সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটি বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। তিনি উল্লেখ করেন, ‘হালখাতা’ ও নবসূচনার আহ্বান নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি বাঙালির জীবনে ফিরে আসে। ধর্মীয়, সামাজিক ও ভৌগোলিক বিভাজন অতিক্রম করে পহেলা বৈশাখ বাঙালির ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রাণবন্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
রাষ্ট্রদূত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে প্রায় একই সময়ে নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ উৎসব বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বকে জোরদার করে। তিনি প্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শন ‘চর্যাপদ’-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরে বাংলাদেশ ও নেপালের ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক সংযোগের দিকটিও তুলে ধরেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও পর্যটন সহযোগিতার শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্যে সার্কের মহাসচিব বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রশংসা করে বলেন, আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বিনিময় দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি পহেলা বৈশাখকে বৈচিত্র্যের মাঝে সম্প্রীতি ও স্বাতন্ত্র্যের এক অনন্য উদযাপন হিসেবে অভিহিত করেন।
অনুষ্ঠানে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আয়োজন করা হয়। নববর্ষের গান পরিবেশনের পাশাপাশি নেপালি গানও পরিবেশিত হয়, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে। বিশিষ্ট নেপালি শিল্পী সাবু লামা এবং স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে বাংলা গান পরিবেশন অতিথিদের মুগ্ধ করে। এছাড়া বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরাও সংগীত পরিবেশন করেন। শিশুদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন খেলাধুলা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়, যা উৎসবের আনন্দ আরও বাড়িয়ে তোলে।
দূতাবাস প্রাঙ্গণ বর্ণিল ফেস্টুন ও ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি সামগ্রী দিয়ে সজ্জিত করা হয়। নকশীকাঁথা, জামদানীসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শাড়ি প্রদর্শন করা হয়। অতিথিদের পরিবেশন করা হয় পান্তা-ইলিশ, বিভিন্ন ধরনের পিঠা ও মিষ্টান্নসহ ঐতিহ্যবাহী বাংলা খাবার।
অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ ও নেপালের ঐতিহ্যবাহী সৌর পঞ্জিকা অনুযায়ী নববর্ষ উদযাপনের অভিন্ন সাংস্কৃতিক বন্ধনকে তুলে ধরে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ এবং নেপালে নববর্ষ—উভয়ই এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পালিত হয়। দুই দেশের এই অভিন্ন ঐতিহ্য ও ঋতুচক্রভিত্তিক উৎসব উদযাপন পারস্পরিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে।
ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবারের পরিবেশনায় নৈশভোজের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন