শুরুটা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার এক ব্যঙ্গ-রসিকতা দিয়ে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই রসিকতাই ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। চাকরির অভাব, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট এবং পরীক্ষাজনিত অনিয়ম নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণদের একটি অংশ এখন সমর্থন দিচ্ছে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনকে।
এরই মধ্যে আজ, শনিবার দিল্লিতে একটি আন্দোলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সমর্থকদের বড় ধরনের অংশগ্রহণ দেখা গেছে। সেখানে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ একাধিক দাবি তোলা হয়।
এক মাসেই জাদু
গঠিত হওয়ার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সিজেপি ইনস্টাগ্রামে ২২ মিলিয়নেরও বেশি অনুসারী অর্জন করেছে—যা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুসারীর সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আজই ভারতে ফিরছেন বলে জানা গেছে।
‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের শুরু কীভাবে
এই আন্দোলনের সূচনা হয় গত ১৬ মে। ভারতের শীর্ষ বিচারপতি সুর্য কান্ত এক আদালত শুনানিতে কিছু বেকার তরুণকে ‘পরজীবী’ এবং ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য গণমাধ্যমে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও ব্যঙ্গের জন্ম দেয়।
সেই সময় অভিজিৎ দীপ যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করছিলেন এবং চাকরি খুঁজছিলেন। তিনি এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট চালু করেন। সেখানে এটিকে ভারতের ‘অবহেলিত, বেকার ও উপেক্ষিত তরুণদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ওয়েবসাইটটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং পরে এটি একটি অনলাইন রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
ভারতে বাড়ছে জেন-জি ক্ষোভ
ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি হলেও, প্রতি বছর কর্মবাজারে প্রবেশ করা লক্ষ লক্ষ তরুণের জন্য পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি হচ্ছে না বলে সমালোচকদের দাবি।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫–২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্ব প্রায় ১০ শতাংশ। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক বিশ্লেষণ বলছে, বাস্তব চিত্র আরও কঠিন।
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে ১৫–২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্ব প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ২৫–২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন বিতর্ক তরুণদের হতাশা আরও বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের একটি বড় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের সন্দেহে বাতিল করা হয়, যেখানে ২২ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। আবার অন্য একটি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশেও গুরুতর ভুল ধরা পড়ে।
মোদির উদ্বেগ কেন
এই আন্দোলনকে দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে দেখা জেন-জি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালে তরুণদের আন্দোলন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটে।
যদিও ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সাম্প্রতিক নির্বাচনে শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং দেশের বড় অংশে ক্ষমতায় আছে, তবুও বিশ্লেষকদের মতে তরুণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের প্রায় ৬৫ শতাংশ জনসংখ্যা ৩৫ বছরের নিচে, কিন্তু দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বেশিরভাগই ষাটোর্ধ্ব বা সত্তরোর্ধ্ব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও ৭৫ বছর বয়সী। এই প্রজন্মগত ব্যবধান অনেক তরুণের মধ্যে প্রতিনিধিত্বহীনতার অনুভূতি তৈরি করছে।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন রাজ্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে সিজেপি কি কেবল একটি অনলাইন ব্যঙ্গ-আন্দোলন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাও বলেছেন, এটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দল হবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আপাতত লক্ষ্য হলো সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তরুণদের সমস্যাগুলো সামনে আনা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন