ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কয়েক দিন ধরে চলা ভয়াবহ দাবানল ক্রমেই আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। স্পেন সীমান্তঘেঁষা পিরেনিজ-ওরিয়ঁতাল অঞ্চলে জ্বলতে থাকা আগুন সোমবার আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘদিনের খরা এবং ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার গতির দমকা বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়ার উন্নতি না হলে আরও এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন।
এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর বনভূমি আগুনে পুড়ে গেছে। পাহাড়বেষ্টিত বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোথাও আগুন গাছের চূড়া ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, আবার কোথাও ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে পুরো এলাকা। অনেক স্থানে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো ম্লান হয়ে পড়েছে। বাতাসে ধোঁয়ার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় শ্বাসকষ্টের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য।
আগুন দ্রুত জনবসতির কাছে পৌঁছে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। জরুরি সতর্কতা জারির পর অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ওষুধ ও অল্প কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কেউ পোষা প্রাণী সঙ্গে নিতে পারলেও অনেকেই শেষ মুহূর্তে সবকিছু ফেলে শুধু প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবারকে স্কুল, ক্রীড়া কমপ্লেক্স এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। আগুন নেভাতে ৭৫০ জনের বেশি দমকলকর্মী, প্রায় ২০০টি অগ্নিনির্বাপণ যান, ৯টি পানিবাহী বিমান এবং একাধিক হেলিকপ্টার কাজ করছে। তবে প্রবল বাতাসের কারণে একটি এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও অন্যত্র নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম বারবার বাধার মুখে পড়ছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ বলেছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আবহাওয়া অনুকূলে না এলে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। তিনি জানান, মানুষের জীবন রক্ষাই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও জরুরি সেবাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি বনাঞ্চলে সাধারণ মানুষের প্রবেশও সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দাবানলের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাইক্লিং প্রতিযোগিতা ট্যুর দে ফ্রান্সেও। নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে প্রতিযোগিতার একটি স্টেজের ফিনিশিং এলাকায় দর্শকদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্য, জরুরি উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপজুড়ে তাপপ্রবাহ ও খরার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে বনাঞ্চল অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে পড়ছে এবং সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গ থেকেও বড় ধরনের দাবানলের সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, চলতি বছর ফ্রান্সে দাবানলের মৌসুম স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুরু হয়েছে। তাদের মতে, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের আরেকটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
ফরাসি আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। ফলে আগুনের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও সময় লাগতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আগুনের বিস্তার রোধ এবং বনাঞ্চল রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফরাসি প্রশাসন।

