বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার সংকটের প্রতিবাদে তিউনিসিয়ার মানুষ আবারও রাস্তায় নেমেছে। আরব বসন্তের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত দেশটির জনগণের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ। পাঁচ বছর আগে প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সিদ্ধান্তের পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ না হওয়ায় হতাশা আরও গভীর হয়েছে।
২০২১ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তিউনিসিয়ার ধুলোময় অভ্যন্তরীণ শহর সিদি বুজিদে তাপমাত্রা ১২৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছেছিল। এই শহর থেকেই ২০১১ সালে আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তখন আশাবাদী ছিলেন কাইস বুয়াজিজি। তাঁর চাচাতো ভাই মোহাম্মদ বুয়াজিজি পুলিশের হয়রানির প্রতিবাদে নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, সেটিই পরবর্তীতে আরব বসন্তে রূপ নেয়।
এর আগে, ২০১৯ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। তিনি দাবি করেন, দেশের সংকট মোকাবিলা ও দুর্নীতি দমনের জন্য এই পদক্ষেপ জরুরি। এর মাধ্যমে তিনি সংসদ স্থগিত করেন, মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন এবং এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
জাতীয় টেলিভিশনে সাঈদ কিছু নথি প্রদর্শন করে দাবি করেন, এতে সরকারের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন— দুর্নীতি দূর করবেন, করোনা মহামারি মোকাবিলা করবেন, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করবেন এবং বিপ্লবের স্বপ্ন পূরণ করবেন।
তবে সেই সময় কাইস বুয়াজিজি সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘দশ বছরের দুর্নীতি দশ দিনে দূর করা সম্ভব নয়। তাকে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত।’ তিনি ২০১৯ সালের নির্বাচনে সাঈদকে ভোট দিয়েছিলেন।
ক্ষমতা একীভূত করার বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানতে চাইলে বুয়াজিজি বলেন, অকার্যকর সংসদ বন্ধ হওয়ায় তিনি তেমন ক্ষতি দেখছেন না।
তিনি জানান, করোনা আক্রান্ত মায়ের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার খুঁজে না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে হতাশ করেছিল। তার ভাষায়, ‘আমরা যখন অক্সিজেনের জন্য লড়ছিলাম, তখন সংসদের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে ব্যস্ত ছিল।’
সাঈদের পদক্ষেপের পর দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে ২০২১ সালে তিউনিসিয়াজুড়ে ভ্রমণ করে দেখা যায়, অনেকেই সরকার পতনে আশাবাদী ছিলেন। উপকূলীয় শহর স্ফ্যাক্সে পুলিশের হেফাজতে নিহত এক তরুণের আত্মীয় সাইদ শুরা তখন বলেছিলেন, ‘আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা এক দশক ধরে দমবন্ধ অবস্থায় আছি। আমরা প্রায় ১১ বছর অপেক্ষা করেছি। আরেক মাস অপেক্ষা করলে ক্ষতি কী?’
কিন্তু পাঁচ বছর পরও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। গত সপ্তাহান্তে দুই হাজারের বেশি তিউনিসীয় আবার রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ‘কাজ, মর্যাদা ও স্বাধীনতা’—২০১১ সালের বিপ্লবের এই মূল লক্ষ্যগুলো থেকে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, সাঈদ সংবিধান পরিবর্তন করে ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দুর্বল করেছেন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করেছেন। বিরোধী নেতা, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আন্দোলনকারী ও অভিবাসী শ্রমিকদের গ্রেপ্তার নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে।
বিক্ষোভে মধ্য-বামপন্থী বিরোধী দল আল জমহুরির মুখপাত্র উইসাম সঘাইর বলেন, ‘আমরা এই দেশের প্রজা নই, আমরাই এর মালিক।” বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—“নিপীড়ন বন্ধ করুন, আমাদের আশা ফিরিয়ে দিন।’ তারা জনপ্রিয় প্রতিবাদী গান ‘দেগাজ’ (অর্থ: বেরিয়ে যাও) গেয়েও প্রতিবাদ জানায়।
তবে অনেক তিউনিসীয়ের কাছে এই আন্দোলনের মূল কারণ রাজনৈতিক নয়, বরং জীবনযাত্রার কঠিন বাস্তবতা। বিদ্যুৎ সংকট, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।
চলতি গ্রীষ্মে তিউনিসিয়ার লাখো মানুষ নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখোমুখি হয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো না হওয়ায় চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে দেশটি। তীব্র গরমে তাপজনিত অসুস্থতায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এমনকি রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতেও আবর্জনা ব্যবস্থাপনা সংকট দেখা দিয়েছে।
একই সঙ্গে দুধ, ডিম ও রুটির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংকট।
২০১১ সালের বিপ্লবের সময় এবং ২০২১ সালের বিক্ষোভেও মানুষ প্রতীক হিসেবে রুটি হাতে রাস্তায় নেমেছিল। সেই রুটি ছিল শুধু খাবারের প্রতীক নয়, বরং সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার দাবির প্রতীক।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক তিউনিসীয় প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতাদের নাম না জানলেও তারা জানেন—খাবারের দাম বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ সংকট তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
এই বিক্ষোভ এখনই প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের সরকারকে পতনের মুখে ফেলবে—এমন সম্ভাবনা কম। তবে এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে তিউনিসিয়ার মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে এবং আরব বসন্তের সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি নিভে যায়নি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন