বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে প্রণালিটি ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং নৌপরিবহনে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, সমুদ্রে মাইন পেতে রাখা, পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকি এবং যুদ্ধবিরতির আলোচনা—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল হরমুজ প্রণালি। এর মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—হরমুজ প্রণালি আসলে কার নিয়ন্ত্রণে?
এককভাবে কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণে?
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। এটি আরব উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম (টিএসএস) অনুযায়ী এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পরিচালিত হয়, যাতে ব্যস্ত জলপথে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল নৌপরিবহন নিশ্চিত করা যায়।
প্রণালির দক্ষিণ তীর ওমানের নিয়ন্ত্রণে, আর উত্তর তীর ইরানের। ওমান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, ইরানের উত্তর উপকূলে বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) কঠোরভাবে টহল দেয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় তারা বিদেশি জাহাজের ওপর নজরদারি এবং বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (আনক্লস) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালীগুলোতে সব দেশের জাহাজের 'নির্দোষ যাতায়াতের' (ইনোসেন্ট প্যাসেজ) অধিকার রয়েছে।
এই আইনের আওতায় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো বিদেশি জাহাজের শান্তিপূর্ণ যাতায়াতে বাধা দিতে পারে না, বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে না এবং শুধু প্রণালী অতিক্রমের জন্য কোনো টোল বা মাশুল আরোপ করতে পারে না। একই সঙ্গে নৌচলাচলের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়েও অন্য দেশগুলোকে সতর্ক করার দায়িত্ব তাদের রয়েছে।
ইরান কি এই কনভেনশনের সদস্য?
ইরান ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনের (আনক্লস) সদস্য নয়। জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী মিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটি এই কনভেনশনে স্বাক্ষর না করায় এর চুক্তিভিত্তিক বিধান তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
উত্তেজনা বাড়ার পর যা ঘটেছে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো করে। ৪ মার্চ আইআরজিসি জানায়, প্রণালিটির ওপর তাদের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে।
এরপর হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শত শত তেলবাহী জাহাজ উপসাগরে আটকা পড়ে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে চাপ সৃষ্টি হয়।
এদিকে, গত ৮ এপ্রিল এক মাসেরও বেশি সময়ের সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। সমঝোতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ইরানে বোমা হামলা স্থগিত করে এবং ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার আশ্বাস দেয়।
তবে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও বিচ্ছিন্ন হামলা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
পিজিএসএ গঠন ও টোল বিতর্ক
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই গত ১৮ মে ইরান পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ (পিজিএসএ) নামে একটি সংস্থা গঠন করে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে অনুমোদন দেওয়া এবং টোল আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর একক সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কোনো বৈধতা নেই।
টোল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ মূলত এখন হরমুজকে ঘিরেই। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ টোল আরোপ করতে পারে না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে কোনো রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নৌপথে একতরফাভাবে মাশুল আরোপের সুযোগ নেই।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক পর্যায়ে ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে, যা তিনি নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বর্ণনা করেন। পরে মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন।
অন্তর্বর্তী সমঝোতা
গত ১২ জুন যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এতে ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানি ব্যবস্থাপনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে বাস্তবে উভয় পক্ষই একাধিকবার এই সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে।
এখন প্রণালি খোলা না বন্ধ?
গত ১২ জুলাই আইআরজিসি ঘোষণা দেয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে এবং অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি পুরোপুরি চালু হবে না।
এর একদিন পর ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও খোলা থাকবে।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, হরমুজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে ইরান পালন করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
জাহাজ চলাচল শিল্পে বড় ধাক্কা
ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত চার মাসে হরমুজ সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল শিল্প ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গত মে মাসে উপসাগরে প্রায় দুই হাজার জাহাজে ২০ হাজারের বেশি নাবিক আটকা পড়েন। অনেকের কাছেই পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।
সংঘাতে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের নাবিক নিহত হয়েছেন।
বিকল্প বাণিজ্যপথের খোঁজ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওমান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সহযোগিতায় একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক করিডোর চালুর উদ্যোগ নেয়।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ফুজাইরাহ ও খোর ফাক্কান বন্দরকে কেন্দ্র করে বিকল্প বাণিজ্য করিডোর সক্রিয় করেছে। পাশাপাশি জরুরি খাদ্য ও ওষুধ পরিবহনের জন্য আকাশপথের ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকায় ফুজাইরাহ ও খোর ফাক্কান বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব বর্তমানে অনেকটাই বেড়েছে। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এসব বন্দরে লজিস্টিকস, শিল্প ও রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়নে শত শত কোটি দিরহাম বিনিয়োগ এবং নতুন চুক্তি হয়েছে।
সূত্র : দ্য খালিজ টাইমস-এর বিশ্লেষণ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন