× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মো. সায়েম ফারুকী

প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ১০:২০ পিএম

বিমানের কার্গো ব্যবসায় ধস

মো. সায়েম ফারুকী

প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ১০:২০ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

বিমান বাংলাদেশের কার্গো খাতে ঢাকা-লন্ডন রুটে ব্যাবসায়িক পতন অর্থনৈতিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ প্রভাবশালী চক্রের ভূমিকায় একসময়ের শক্তিশালী এই রুট ধীরে ধীরে চলে গেছে বিদেশি এয়ার লাইন্সগুলোর নিয়ন্ত্রণে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ফলে এই রুট থেকে বছরে শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটিকে।

বিমানের জরুরি সভার কার্যবিবরণী ও অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের এক প্রভাবশালী নেতার সরাসরি হস্তক্ষেপে ব্রিটিশ-বাংলাদেশ কমিউনিটির সফল ও প্রাচীনতম কার্গো প্রতিষ্ঠান জেএমজি কার্গো অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেডকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই লন্ডন রুটে ব্যাবসায়িক ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে। এর পরিণতিতে রুটটিতে বিমানের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে এই বাজারের বড় অংশ দখল করে নেয় আন্তর্জাতিক অন্যান্য এয়ার লাইন্স ও লজিস্টিক অপারেটররা।

রূপালী বাংলাদেশের হাতে আসা বিমানের বেশকিছু অভ্যন্তরীণ নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শুধু ঢাকা-লন্ডন রুট থেকে বিমান বাংলাদেশের কার্গো আয় ছিল ৪৭ কোটি টাকার বেশি। এর একটি বড় অংশ নির্ভর করত জেএমজি কার্গো এজেন্টের কার্যক্রমের ওপর। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে চুক্তি কাঠামো ও এজেন্ট ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পর কার্গো প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে এই রুট থেকে আয় নেমে আসে প্রায় ৫.৯৩ কোটি টাকার কাছাকাছি, যা নাটকীয় পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরে বিভিন্ন বছরে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও বাজার পুনরুদ্ধার করা যায়নি। বরং ধীরে ধীরে লন্ডন রুটে বিমানের অবস্থান দুর্বল হয়ে বিদেশি এয়ার লাইন্সগুলোর দখলদারিত্ব বাড়তে থাকে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে টানা জেএমজি কার্গো বিমানের সঙ্গে সফলভাবে ব্যবসা করে আসছিল। বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের সঙ্গে জেএমজি কার্গোর ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর ও ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর পৃথক কার্গো সেলস এজেন্ট এগ্রিমেন্ট ও লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক প্রণোদনা চুক্তি সম্পাদিত হয়।

অভ্যন্তরীণ নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সঙ্গে কাজ করা জেএমজি কার্গো সেলস এজেন্টকে বাদ দেওয়ার পর থেকে এই পতনের শুরু। বলা হয়, ওই এজেন্ট ঢাকা-লন্ডন রুটে প্রতি ফ্লাইটে গড়ে আট টন পর্যন্ত কার্গো সরবরাহ করত, যা পরে তিন টনে নেমে আসে।

একটি মহলের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ দুষ্টচক্রের কারণেই ঢাকা-লন্ডন রুটে কার্গো বাণিজ্য হারিয়েছে বিমান। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপভিত্তিক একাধিক আন্তর্জাতিক এয়ার লাইন্স এই বাজারের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশি পণ্যের যুক্তরাজ্যের বাজারে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন রপ্তানিকারক ও প্রবাসী ব্যবসায়ীরা।

বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ রুটে ধারাবাহিক পতনের কারণে ২০২৩ সালে বিমান বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

বিমান বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ বিপণন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বাজার ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং বলা হয়, বাজার হারানোর পেছনে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাও ভূমিকা রেখেছে।

একপর্যায়ে বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিম দ্রুত জেএমজিকে পুনরায় ব্যবসায় যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও তার বদলির পর পুরো প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বিমানের ভেতর থেকে নেওয়া একাধিক প্রস্তাব ও প্রতিবেদন দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে লন্ডন অফিস থেকে জেএমজি কার্গোকে নতুন করে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে কিছু শর্ত সংযুক্ত করে ই-মেইল পাঠানো হলেও রহস্যজনক কারণে পরে পূর্বের শর্ত অনুযায়ী পুনর্বহালের উদ্যোগও ধীরগতিতে এগিয়েছে বলে জানা যায়।

জেএমজি কার্গোর ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আমরা প্রবাসীদের কাছে বিমানের সেবা পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছি। আমাদের বাদ দেওয়ার পর ঢাকা-লন্ডন রুটে পণ্য পাঠাতে প্রবাসীরা বাধ্য হয়ে বিদেশি এয়ার লাইন্স বেছে নিচ্ছেন, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমরা চাই, বিমান বাংলাদেশ আমাদের পুনর্বহাল করে এই রুটের কার্গো আয় আগের মতো ফিরিয়ে আনুক।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জেএমজিকে বাদ দেওয়ার পর গত পাঁচ বছরে বিমান কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হলেও কোনো সুরাহা বা সুবিচার মেলেনি। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর লিখিত আবেদন করা হলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। বর্তমানে দেশে দীর্ঘদিন পর নির্বাচিত সরকার আসায় সুবিচার পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও কার্গো ব্যবহারকারীরা বলছেন, বিমান বাংলাদেশের সেবা ও সক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে বিদেশি এয়ার লাইন্স ব্যবহার করছেন। বিকল্প না থাকায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটি তাদের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য কার্গো সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে রূপালী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বিমান বাংলাদেশের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলামের সঙ্গে। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি এবং খুদে বার্তা পাঠানোর পরও সাড়া দেননি। এরপর জনসংযোগ বিভাগের জুনিয়র অফিসার সাধন অধিকারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি এ বিষয়ে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

একজন প্রবাসী ব্যবসায়ী বলেন, আগে আমরা খুব সহজে ও তুলনামূলক কম খরচে বিমান বাংলাদেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠাতে পারতাম। তখন ব্যবসা পরিচালনাও ছিল বেশ স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এখন বাধ্য হয়ে বিকল্প এয়ারলাইন্সের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের খেসারত শেষ পর্যন্ত আমাদেরই দিতে হচ্ছে, যা আমাদের ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রবাসী সম্প্রদায়ের আস্থা ও স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ না হলে এই রুটে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Link copied!