× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আসাদুজ্জামান তপন

প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম

‘চাঁদ থেকে ক্রিস্টিনা আন্টি ফেরে, কিন্তু মা ফেরে না’

আসাদুজ্জামান তপন

প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

চিকিৎসকের অবহেলার কারণে সদ্য মমতাময়ী মা তাসলিমাকে হারিয়েছে তিন শিশুসন্তান সামিয়া, লামিয়া ও আয়েশা। তাদের হতদরিদ্র বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক সজল মিয়া। মৃত্যু কি বুঝে ওঠার মতো বয়স এই তিন শিশুর কারোই হয়নি। ছোটটির বয়স মাত্র আট মাস আর বড় দুজনের আট ও ছয় বছর। বুকফাটা কান্না চেপে রেখে তিন অবুঝ কন্যাকে বাবা সান্ত্বনা দেন এই বলে, ‘তাদের মা চাঁদের দেশে গেছে কাজ করতে। সেখানে চাঁদের বুড়িকে সুতা কাটতে সহযোগিতা করে। সেখানে বেতন পেয়ে অনেক টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরবে। তোদের জন্য কিনে আনবে খেলনা আর রঙিন পোশাক।’ মা-হারা শিশুরা বাবার কথাকেই মেনে নেয় সরলমনে। অপেক্ষায় থাকে মায়ের ফিরে আসার।

এর মধ্যে সজল মিয়া গত শনিবার রাতে সন্তানদের বলেন, ‘তোমরা জানো, আজ চাঁদের দেশ থেকে চারজন দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে একজন আন্টিও আছেন, যার নাম ক্রিস্টিনা। তার সঙ্গে তোমাদের মায়ের দেখা হয়েছিল।’ একথা শুনে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে সামিয়া- ‘সত্যি বাবা? আন্টিকে একটা ফোন দাও তো। আমি কথা বলব। জানতে চাইব, ক্রিস্টিনা আন্টি, সত্যি কি মায়ের সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে? কি বলেছে মা? আমাদের কথা কিছু জিজ্ঞাসা করেছে? কবে আসবে? আমাদের জন্য কী অনেক খেলনা আর জামাকাপড় কিনেছে? আর কি কি কিনেছে? কবে ফিরবে মা?’ সামিয়ার কথায় নিজেকে আর আটকাতে পারেন না সজল, কান্নায় ভেঙে পড়েন। বুকে জড়িয়ে ধরেন সামিয়াকে। বলতে পারেন না যে, ‘তোদের মা আর কখনোই ফিরবে না।’

সজলের পরিবারের এই কান্না এখন প্রতিদিনের ঘটনা। অশ্রুসজল চোখে তিনি জানান, প্রসব বেদনায় কাতরানো অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে। পরদিন নবজাতক ও তার মাকে নিয়ে হাসিমুখে ফেরেন বাসায়। ‘কিন্তু কে জানত এই হাসিখুশির মাঝেই হাসপাতাল থেকে সবার অজান্তে পিছু নিয়েছিল মৃত্যুদূত। সেই মৃত্যুদূত আর কেউ নয়, সিজারের সময় তাসলিমার পেটের ভেতর চিকিৎসকের অবহেলায় থেকে যাওয়া এক টুকরো ব্যান্ডেজ বা ১০ মিলিমিটার গজ। সেই গজ পচে সৃষ্ট হয় ইনফেকশন। সাত মাস পর অন্য চিকিৎসকরা আমার স্ত্রীর পেটের ভেতর থেকে খুঁজে বের করেন সেই গজ বা ব্যান্ডেজের টুকরো। তারা ধিক্কার জানান সিজার করা সেই চিকিৎসককে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? আমি আবারও স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম। তবে জীবিত নয়, তার লাশ নিয়ে।’

সজল বলেন, ‘আমি কাকে দোষ দেব? আমি কি বলব, যে হাসপাতালে এই সিজারটি হয়েছে সেটি কসাইখানা, আর ওই চিকিৎসক একজন কসাই? নাকি পুরো বিষয়টাকেই আমি এক দরিদ্র গাড়িচালকের কপালের লিখন হিসেবে ছেড়ে দেব। কিন্তু সেটাই বা কেন? একজন অপরাধীকে কি এভাবে ছাড় দেওয়া যায়? থানা-পুলিশ-আদালত করে বিচার চাওয়ার সামর্থ্য বা সাধ্য হয়তো আমার নেই, কিন্তু অধিকার তো আছে। আমি সেই অধিকারের দাবিই তুলে ধরছি।’ কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন সজল মিয়া।

সজলের ভাষ্য অনুসারে, দুই সন্তান ও স্ত্রী তাসলিমাকে নিয়ে তিনি মোহাম্মদপুরের জাফরাবাদ এলাকার এক বস্তিতে থাকেন। তৃতীয় সন্তানের মা হতে চলেছিলেন তাসলিমা। প্রসবব্যথা উঠলে গত ৬ আগস্ট তাকে ভর্তি করা হয় মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু হাসপাতালে। সরকারি প্রতিষ্ঠান এটি। ওইদিনই সিজারের মাধ্যমে জন্ম নেয় নবজাতক। হাসপাতালের নথিমতে সিজার করেন ডা. দিলশাদ ও ডা. এমদাদ। সঙ্গে ছিলেন নাজনিনসহ অপারেশন-সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন। সুস্থ মা ও নবজাতককে নিয়ে বাসায় ফেরেন সজল মিয়া।

এভাবে কেটে যায় প্রায় এক মাস। এরপর পেটে ব্যথা শুরু হয় তাসলিমার। গ্যাস্ট্রিক বা সাধারণ ব্যথা ভেবে দোকান থেকে ওষুধ এনে স্ত্রীকে খাওয়ান সজল মিয়া। এতে সাময়িক ব্যথা কমলেও ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এভাবেই কেটে যায় প্রায় ৬-৭ মাস। একসময় অসহ্য হয়ে ওঠে ব্যথা। উপয়ান্তর না পেয়ে স্ত্রীকে এবার বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান সজল। শেষপর্যন্ত গত ৪ মার্চ তাসলিমাকে নেওয়া হয় ধানমন্ডির জাস্টিস আমিন আহমেদ চ্যারিটি ক্লিনিকে। সেখানে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকরা জানান, তার অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে এবং অপারেশন করা দরকার। এর তিন দিন পর গত ৭ মার্চ তাসলিমাকে ভর্তি করা হয় কলাবাগানের মেডি এইড হাসপাতালে। ওইদিনই শল্য চিকিৎসক ডা. মীর রাশেদ আলম অভি অপারেশনের সময় দেখতে পান, তাসলিমার পেটের ভেতর ডেলিভারির সময় আগের চিকিৎসকের রেখে দেওয়া পচন ধরা গজ। তিনি বুঝতে পারেন, অ্যাপেন্ডিসাইটিস নয়, মূলত এই পচন থেকেই কঠিন ইনফেকশন হয়েছে তাসলিমার পেটে। ১০ মার্চ পর্যন্ত মেডি এইড হাসপাতালে ছিলেন তাসলিমা। এর মধ্যে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা দ্রুত আইসিইউ আছে- এমন কোনো হাসপাতালে নিতে পরামর্শ দেন। দরিদ্র সজল মিয়ার তখন মাথায় বাজ পড়ার অবস্থা। তিনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের সহায়তায় গত ১৩ মার্চ তাসলিমাকে ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। রাখা হয় লাইফ সাপোর্টে। কিন্তু প্রেমময় স্বামী আর আদরের ধন সন্তানদের কাছে ফিরতে পারেননি তাসলিমা। ১৫ মার্চ দুপুর ১২টা ৯ মিনিটে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।

চিকিৎসক মীর রাশেদ আলম অভিও ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিখিতভাবে জানান, অ্যাপেন্ডিসাইটিস ভেবে অস্ত্রোপচার করে দেখা যায়, কোনো অ্যাপেন্ডিসাইটিস নেই। বরং আগের সিজার ডেলিভারির সময় বা আগের অস্ত্রোপচারের সময় তাসলিমার পেটে রাখা গজ পাওয়া যায়। এই গজে পচন ধরে খাদ্যনালি এবং খাদ্যনালির ওপরের পর্দা বা ওমেন টার্মেও পচন ধরে। পরে সেটা পুরো পেটে ছড়িয়ে পড়ে ইনফেকশন আকারে।

রূপালী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হয় মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক ডা. মো. মনিরুজ্জামানের কাছে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিতে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। বলেন, অভিযোগ আনলেই তো আর হবে না। আর কোথায় তাসলিমার স্বামী অভিযোগ করেছেন? ডিজি হেলথ এখানে কি করবেন? পুলিশের কাছে আবেদন জানিয়ে কোনো লাভ নেই। অভিযোগ করতে হবে তাদের কাছে। এরপর তারা তদন্ত করে দেখবেন কার দোষে বা কেন এটা হয়েছে। এরপর যদি প্রমাণ হয় যে, তার প্রতিষ্ঠানের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, তখনই এটা নিয়ে কোনো পত্রিকায় নিউজ হতে পারে, এর আগে নয়।

ডা. মরিুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলার আগের দিন হাসপাতালে গিয়ে কৌশলে তাসলিমার অপারেশনের সব কাগজ খুঁজে বের করে সেগুলোর ছবি সংগ্রহ করা হয়। তাসলিমার ভর্তি নথির ক্রমিক নম্বর ৩৩। নথি অনুসারে সিজার করেন ডা. দিলশাদ এবং ডা. এমদাদ। এই দুই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে সহকারী পরিচালক মনিরুজ্জামানের সহযোগিতা চাইলে তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। বলেন, ‘ওনাদের ঠিকানা আমি আপনাকে কেন দেব? আর ওনারা ট্রেইনি চিকিৎসক এবং এখন এখানে তারা নেই।’ তিনি বারবার তাসলিমার মৃত্যুর বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বলেন, ‘এটি কোনো সাংবাদিকতা হতে পারে না।’ উল্টো তিনি এই ঘটনার জন্য মেডি এইড হাসপাতালকে দায়ী করে বলেন, ‘তাদের কোনো ব্যর্থতা আছে কি না, বা ওই চিকিৎসকই ভুল করেছেন কি না, সেটা তদন্ত হওয়া উচিত। আপনি আমাদেরটা বাদ দিয়ে ওইটা দেখুন।’

এ বিষয়ে শল্য বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আবদুস সালাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আধুনিক অপারেশন থিয়েটারে গজ বা যন্ত্রাংশ রেখে সেলাই হয়ে যাওয়া প্রতিরোধে নির্দিষ্ট প্রটোকল রয়েছে। অপারেশনের আগে ও পরে গজ-ইনস্ট্রুমেন্ট গণনা, সার্জিক্যাল চেকলিস্ট, টিম ব্রিফিং- এসব বাধ্যতামূলক ধাপ। গজ পেটে থেকে যাওয়া অত্যন্ত গুরুতর অবহেলা। এটি সাধারণত টিমের একাধিক স্তরের ত্রুটির ফল। সঠিকভাবে গণনা ও যাচাই করলে এ ধরনের ঘটনা হওয়ার কথা নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমন ঘটনার ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত জরুরি। কারণ এতে শুধু একজন চিকিৎসক নন, পুরো অপারেশন টিম ও প্রতিষ্ঠানের দায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’

দেশে চিকিৎসা নিয়ে অবহেলার এই ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা আইনি লড়াইয়ে এগোতে পারেন না। এর কারণ- প্রমাণ সংগ্রহ, দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা।

স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের প্রতিনিধি বলেন, রিটেইন্ড গজের মতো ঘটনা প্রিভেন্টেবল বা প্রতিরোধযোগ্য। এগুলোকে সিস্টেম ফেইলিউর হিসেবে দেখতে হবে। নিয়মিত অডিট, সার্জিক্যাল সেফটি চেকলিস্টের কঠোর প্রয়োগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এমন ঘটনা বন্ধ হবে না।

গত শনিবার বিকেলে তাসলিমার স্বামী সজল মিয়ার সঙ্গে কথা হয় তার বাসায়। তিন শিশুসন্তানকে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সজল বলেন, একজন দরিদ্র গাড়িচালক হয়ে কিভাবে এই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন তিনি। এখন গণমাধ্যমই তার একমাত্র ভরসা ও আস্থার জায়গা। আদালতে মামলা করা বা থানা-পুলিশ করা অনেক টাকার ব্যাপার। এরপরও তিনি পুলিশ কমিশনার এবং স্বাস্থ্য মহা অধিদপ্তরের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যদি তারা সদয় হয়ে তদন্ত করেন এই প্রত্যাশায়।

সজলের কথায়, তিনি গরিব বলে কি বিচার পাবেন না? চিকিৎসার খরচ জোগাতে অনেক ধারদেনা করেছেন। এখন তার কাঁধে ঋণের বোঝা আর তিন অবুঝ সন্তানের দায়িত্ব। তার প্রশ্ন, ‘যদি একজন ডাক্তার ভুল করে মানুষ মেরে ফেলেন, তার কি কোনো জবাবদিহিতা নেই?’

সজল বলেন, এই মৃত্যুর বিচার শুধু তার পরিবারের দাবি নয়, এটি জনস্বাস্থ্যেরও নিরাপত্তার প্রশ্ন। এখন দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের; সত্য উদঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা দরকার। একটি গজের ভুলে আর যেন কোনো শিশু তার মাকে না হারায়।

Link copied!