জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে ’২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘ আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনা করে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন কালক্রমে জনমানুষের মৌলিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার গণসংগ্রামে রূপ নেয়, যার ধারাবাহিকতায় আন্দোলনের সম্মুখ সারির নেতারা অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তবে বর্তমানে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ছাত্র উপদেষ্টারা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেননি। এই ব্যর্থতার ছায়া পড়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ওপরও। অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও আদর্শিক বিচ্যুতির অভিযোগে দলটির অনেক শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করায় সেখানে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে দল গোছানোয় ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব দলটিকে রাজনীতির মাঠে পেছনের সারিতে ঠেলে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তরুণ নেতৃত্ব আবারও ঘুরে দাঁড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা রাজনীতি বিশ্লেষকদের।
২০২৪ সালের ৫ জুন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে নারী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং জেলা কোটা ১০ শতাংশ বাতিল করে বাংলাদেশ সরকারের জারি করা পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পর কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন করে শুরু হয়। এই আন্দোলনে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকার দমন-পীড়ন শুরু করলে এটি অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। যার প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতন। তবে রাজপথে নেমে আসা লাখো ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা ছিল আরও বিস্তৃত। গণঅভ্যুত্থানের সেই প্রত্যাশা লিখিত ইশতেহারে না থাকলেও মিছিল, স্লোগান, বক্তৃতা এবং দেয়াল লিখনে ফুটে ওঠে। ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’, ‘আমরাই গড়ব বৈষম্যহীন সরকার’, ‘মেয়ে-ছেলে বৈষম্য নয়, মানুষ হিসেবে সবার পরিচয়’, ‘ধর্মবৈষম্য নিপাত যাক’, ‘সমতল থেকে পাহাড়, এবারের মুক্তি সবার’, ‘চা-শ্রমিকের বেতন বাড়াও’, ‘একজন রিকশাচালকের সন্তানও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখে’, ‘এলিটদের রাষ্ট্রব্যবস্থা না, গণমানুষের রাষ্ট্রব্যবস্থা’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ ইত্যাদি। এসব দেয়াল লিখনের মধ্য দিয়ে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সব ধরনের বৈষম্য থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি ওঠে। অথচ অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর ক্ষমতায় থাকলেও এসবের কোনোটি পূরণ হয়নি। একই সঙ্গে আন্দোলনের মহানায়ক, পরবর্তীকালে সরকারের ছাত্র উপদেষ্টারা বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
জেন-জিদের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা গণমানুষের আস্থা অর্জনে কেন ব্যর্থ হলেন এ বিষয়ে ইতিহাস গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জুলাইয়ের সম্মুখসারির তরুণ নেতাদের গণমানুষের আরও কাছে গিয়ে তাদের প্রত্যাশা বাস্তবভাবে বোঝার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সময় না দিয়ে তারা দ্রুত ক্ষমতার অংশ হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারে যুক্ত হওয়ায় জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেটির অবস্থান নিয়ে পরবর্তীকালে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে মব সংস্কৃতি বা জামায়াতঘেঁষা হওয়ার কারণে জনগণের আস্থাহীনতা বাড়ে, যেখানে মানুষ তাদের কাছ থেকে একটি মধ্যপন্থি ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি প্রত্যাশা করেছিল।
এদিকে তরুণ নেতৃত্ব বা এনসিপি মধ্যপন্থার রাজনীতি করার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত সে অবস্থানে থাকতে পারেনি দলটি। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে নাহিদ ইসলাম (এনসিপির আহ্বায়ক) বলেছিলেন, জামায়াতের নেতৃত্বে মানুষ আস্থা রাখবে না। তাদের ঐতিহাসিক ভুলগুলো জনগণ মনে রেখেছে। তা ছাড়া ইসলামিস্ট রাজনীতিতে মানুষের আস্থা নেই এবং এই রাজনীতির ভবিষ্যৎও বাংলাদেশে নেই। তবে সময়ের পালাবদলে এনসিপি-জামায়াত মিলেই গড়ে ওঠে রাজনৈতিক জোট।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক রইস উদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তরুণ নেতৃত্বের ওপর জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ না হওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই এই হতাশার প্রধান কারণ। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রাজনীতিতে সক্রিয় ছাত্রনেতাদের উচিত অতীতের ভুলগুলো চিহ্নিত করা এবং কেন মানুষ আশাহত হয়েছে তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের স্বার্থে ভুল-ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যেহেতু আগামী দিনের নেতৃত্ব তরুণ সমাজ থেকেই উঠে আসবে, তাই তারা অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তুলবে এটাই প্রত্যাশা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক ড. শামছুল আলম সেলিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জুলাইয়ের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের ওপর গণমানুষের ব্যাপক ভরসা ও প্রত্যাশা ছিল। অভ্যুত্থানে আহত ও শহিদ পরিবার তাদের ওপর আস্থা রেখেছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সম্মুখসারির নেতাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাধারণ মানুষ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তা দ্রুত ভেঙে যেতে দেখে। তিনি বলেন, ছাত্র উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সামনের সারির নেতাদের গাড়িবহর, অভিজাত হোটেলে নানা রাজনৈতিক আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ছাত্র উপদেষ্টা থাকাকালে তাদের ও তাদের নিকটজনদের ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক মানুষের মনে হতাশা বাড়ায়। তিনি আরও বলেন, নেপালে জেন-জি আন্দোলন থেকে উঠে এসে বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন, কারণ তিনি মানুষের সঙ্গে মিশেছেন এবং তাদের সমস্যা সমাধানে সময় দিয়েছেন। তবে আমাদের দেশে ছাত্রনেতারা অতিদ্রুত ক্ষমতার স্বাদ পেতে গিয়ে আস্থাহীনতা তৈরি করেছেন। একই সঙ্গে তড়িঘড়ি রাজনৈতিক দল গঠন এবং মধ্যপন্থার ঘোষণা দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া তাদের জন্য আরও আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারে থাকাকালে ছাত্র উপদেষ্টাসহ তাদের পিএস-এপিএসদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে, যেগুলোতে ছাত্র উপদেষ্টারা তাদের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট করেননি। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নাহিদ ইসলাম এবং মাহফুজ আলমের নেতৃত্ব এবং তাদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ জনমনে আস্থাহীনতা বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। গুলশানে চাঁদাবাজির এক ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত এক ব্যক্তি আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া নাহিদ ইসলামের এপিএসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ ওঠে। তথ্য উপদেষ্টা থাকাকালে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধে ‘শতকোটি টাকা’ লোপাট বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে সে সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা ছাত্র উপদেষ্টাদের নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, তার পিএস/এপিএসের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং টিভির লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ দাবি করার অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে।
তরুণ নেতাদের বিরুদ্ধে এমন নানা অনিয়মের অভিযোগ, জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রতিবাদে এনসিপিতে দল গঠনের পরপরই পদত্যাগের হিড়িক পড়ে। সে সময় দল ছাড়েন ডজনের বেশি শীর্ষ নেতা। যদিও বর্তমানে এনসিপিতে গতি ফেরাতে দল থেকে পদত্যাগকারীদের ফেরানোর চেষ্টাসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাবেক সমন্বয়ক ও ফ্রন্টলাইনের পরিচিত অনেককে যুক্ত করতে কাজ শুরু করেছে দলটি।
বিশ্লেষকদের মতে, জেন-জি নেতাদের বড় শক্তি হলো প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ, সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সক্ষমতা। তবে মাঠপর্যায়ের সংগঠন, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাদের অভিমত, রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, সংগঠন শক্তিশালী করা এবং বাস্তব কাজের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করা জরুরি। এই জায়গাগুলোতে ঘাটতি থাকলে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, বৈষম্যহীন সমাজ কাঠামো, মৌলিক মানবিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বুকে লালন করে ’২৪-এর অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। তবে দেশজুড়ে ভিন্নমতাবলম্বী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু ও নারীদের ওপর হামলা-হয়রানি, মব-সহিংসতা, একের পর এক মাজারে হামলা, বিভিন্ন মেলা, ওরস ও বাউল উৎসব বন্ধ, নাটক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে বাধা এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হামলা-হুমকির ঘটনা মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পরও এসব পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে আশার কথা হলো, এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের কিছু আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেই আকাঙ্ক্ষা বুকে ধারণ করে এখনো স্বপ্ন দেখছে জনগণ। তরুণদের ওপর এখনো আস্থা রাখতে চায় সাধারণ মানুষ। সেই আস্থার জায়গা ফিরিয়ে আনবেন যোগ্য ও মেধাবী তরুণরা এমনটিই প্রত্যাশা বিশ্লেষকদের।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন