শিক্ষকদের পদোন্নতির দাবিতে ডাকা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচিতে স্থবির হয়ে পড়েছে বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। দুদিন ধরে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখন সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। এতে চরম অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ ‘সেশনজটের’ শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
রোববার সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে সোমবার থেকে সব ধরনের ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে আন্দোলনরত ‘শিক্ষক সমাজ’। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক রাহাত হোসেন ফয়সাল এবং সিন্ডিকেট সদস্য শিক্ষক তানভীর কায়সার পদত্যাগ করেছেন।
এদিকে ১০৬ শিক্ষকের স্বাক্ষরিত ‘রেজ্যুলেশনে’ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কথাও জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা।
সোমবার থেকে বিশ^বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রমে ‘শাটডাউন’ শুরু করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। রাতে শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে সভা করে দুই দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
আন্দোলনরত শিক্ষকদের পক্ষে বিশ^বিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, সোমবার রাতে চলমান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের এক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শিক্ষকরা দুটি দাবি উত্থাপন করেন।
দাবিগুলো হলোÑ সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত অভিন্ন নীতিমালার আলোকে সংবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ বাতিল এবং বিদ্যমান পদোন্নতি নীতিমালা-২০১৫ অনুযায়ী বিশ^বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকের পদোন্নতি নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরই মধ্যে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু হয়েছে। সবার স্বাক্ষর নেওয়া শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হবে।
এর আগে, ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি অনুযায়ী সোমবার সকাল ৯টা থেকে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিচতলায় অবস্থান নেন। ১০টার পর ‘শিক্ষকদের চাপে’ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার তার কার্যালয় ত্যাগ করেন। পরে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষসহ বিভিন্ন দপ্তরের ফটকে তালা দিয়ে দেয়।
সরজমিনে দেখা গেছে, শিক্ষকদের ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকার কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাস প্রায় শূন্য। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদি হাসান বলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। এখানে শিক্ষক ও রিসোর্সদের সংকট রয়েছে। যার কারণে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। পরীক্ষা দেরিতে হয়; ফল দিতে দেরি হয়। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট লেগেই থাকে। শিক্ষকরা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি দিতেছে, এতে সেশনজটের পরিধি আরও বাড়ছে। আমাদের চার বছরের কোর্স যেখানে পাঁচ বছরের শেষ হতো, এখন ছয় বছরে শেষ হবে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না। দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষা শুরু করার দাবি করেছেন ওই শিক্ষার্থী।
নাজমুল ঢালী নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এমনিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্টে সেশনজট রয়েছে। ‘শাটডাউনের’ কারণে অনেক ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর স্থগিত রয়েছে। শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে কী করতে যাচ্ছেন- সেটাও আমরা জানি না। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অশ্চিয়তায় রয়েছি। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ‘শাটডাউনের’ কারণে সব বন্ধ। সামনে আবার এক মাসের বন্ধ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে পড়বে।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমরা মর্মাহত। আমরাও ক্লাস নিতে চাই। তার প্রমাণ হলো, অতিরিক্ত ওয়ার্কলোড নিয়েও নিয়মিত ক্লাস নেওয়া। প্রতিদিন যেখানে দুই থেকে তিনটি ক্লাস নেওয়ার কথা, সেখানে আমাদের সাত থেকে আটটি সেশনের ক্লাস নিতে হয়। আমাদের দাবি ন্যায্য পদোন্নতি। কিন্তু উপাচার্য তা দিচ্ছেন না। তিনি সকালে এক কথা বলেন, আবার বিকেলে আরেক কথা বলেন। তার প্রতি আমাদের কোনো আস্থা নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, ইউজিসির সংবিধি অনুযায়ী পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দিতে চার থেকে পাঁচ মাস সময় লাগবে। কিন্তু শিক্ষকরা এখনই পদোন্নতি চান। তাদের দাবি অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া হলেও পরে যদি ইউজিসি বেতন-ভাতা অনুমোদন না দেয়, তা হলে সেই দায়িত্ব কে নেবে।

