× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এস ডি সুব্রত

প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৬:০৫ এএম

দার্শনিক সক্রেটিস

মৃত্যুর পেয়ালায় অমরত্ব অন্বেষণ

এস ডি সুব্রত

প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৬:০৫ এএম

মৃত্যুর পেয়ালায় অমরত্ব অন্বেষণ

সক্রেটিস ছিলেন  গ্রিসের একজন বিখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তাবিদ। তিনি পাশ্চাত্য দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা দার্শনিক হিসেবে খ্যাত। তিনিই সর্বপ্রথম আত্মাকে কল্পনা করেছিলেন একটি বুদ্ধিসঞ্জাত নৈতিক শক্তি হিসেবেÑ এমন শক্তি যা ব্যক্তির ভালো বা মন্দ আচরণের জন্য দায়ী। সক্রেটিস, একজন বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক। বিশ্বে যতজন বড় দার্শনিকের জন্ম হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম। তার জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ২ হাজার বছর ধরে উপকৃত হয়েছে পশ্চিমা দর্শন, সংস্কৃতি ও সভ্যতা। সক্রেটিসের জন্ম খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৯। পিতা সফরেনিকাশ ছিলেন স্থপতি। পাথরের নানা মূর্তি গড়তেন মা ফেনআরেট। ছিলেন ধাত্রী। পিতা-মাতা দুজনেই পেশাজীবী হলেও সংসারে অভাব লেগে থাকত সবসময়। তাই ছেলেবেলায় পড়াশোনার পরিবর্তে পাথর কাটার কাজ নিতে হয়েছিল সক্রেটিসকে। অদম্য জ্ঞানস্পৃহা সক্রেটিসের। যখন যেখানে যেটুকু জানার সুযোগ পান সেটুকু জ্ঞান সঞ্চয় করেন। এমনি করেই বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। একদিন ঘটনাচক্রে পরিচয় হলোÑ এক ধনী ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি সক্রেটিসের ভদ্র ও মধুর আচরণে, বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিলেন। পাথরের কাজ ছেড়ে সক্রেটিস ভর্তি হলেনÑ এনাক্সগোরাস নামের এক গুরুর কাছে। কিছুদিন পর কোনো কারণে এনাক্সগোরাস আদালতে অভিযুক্ত হলে সক্রেটিস আরখ এখলাসের শিষ্য হলেন। এই সময় গ্রিস ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ফলে নিজেদের মধ্যে মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত।

দেশের প্রতিটি তরুণ, যুবক, সক্ষম পুরুষদের যুদ্ধে যেতে হতো। সক্রেটিসকেও এথেন্সের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে অ্যামপিপোলিস অভিযানে যেতে হলো। এই যুদ্ধের পর তার মন ক্রমশই যুদ্ধের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠল। চিরদিনের মতো সৈনিকবৃত্তি পরিত্যাগ করে ফিরে এলেন এথেন্সে। এথেন্স তখন জ্ঞান-গরিমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শৌর্য, বীর্যে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির এক স্বর্ণযুগ। এই পরিবেশে নিজেকে জ্ঞানের জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলেন না সক্রেটিস। তিনি ঠিক করলেন জ্ঞানের চর্চায়, বিশ্ব প্রকৃতি জানার সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন। সক্রেটিসের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মাধ্যমে প্রথমে প্রতিপক্ষের মত স্বীকার করে পরে যৌক্তিক উপায়ে তা খ-ন করতেন। বিরুদ্ধপক্ষের জন্য তিনি তর্কের ফাঁদ পাততেন এবং পরাজিত হয়ে যতক্ষণ না প্রতিদ্বন্দ্বী নিজের ভুল স্বীকার করে, ততক্ষণ তাকে প্রশ্ন করতেন।

অনবরত প্রশ্ন করে উপকথকের মন থেকে ভুল ধারণা দূর করে তার মুখ থেকেই তিনি সত্য বের করতেন। প্রতিদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে সামান্য প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়তেন। খালি পা, গায়ে একটা মোটা কাপড় জড়ানো থাকত। কোনোদিন গিয়ে বসতেন নগরের কোনো দোকানে, মন্দিরের চাতালে কিংবা বন্ধুর বাড়িতে। নগরের যেখানেই লোকজনের ভিড় সেখানেই খুঁজে পাওয়া যেত সক্রেটিসকে। প্রাণ খুলে লোকজনের সঙ্গে গল্প করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছেন, নিজে এমন ভাব দেখাতেন যেন কিছুই জানেন না, বোঝেন না। লোকের কাছ থেকে জানার জন্য প্রশ্ন করছেন।

আসলে প্রশ্ন করা, তর্ক করা ছিল সে যুগের এক শ্রেণির লোকদের ব্যবসা। এদের বলা হতো সোফিস্ট। যারা নিজেদের পা-িত্যের অহংকার করত, বীরত্বের বড়াই করত, তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করতেন, বীরত্ব বলতে তারা কী বোঝে? পা-িত্যের স্বরূপ কী? তারা যখন কোনো কিছু উত্তর দিত, তিনি আবার প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজিয়ে বুঝিয়ে দিতেন তাদের ধারণা কত ভ্রান্ত। মিথ্যা অহমিকায় কতখানি ভরপুর হয়ে আছে তারা। নিজেদের স্বরূপ এভাবে উদ্ঘাটিত হয়ে পড়ায় সক্রেটিসের ওপর তারা সকলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। কিন্তু সক্রেটিস তাতে সামান্যতম বিচলিত হতেন না। নিজের আদর্শ, সত্যের প্রতি তার ছিল অবিচল আস্থা। সেই সঙ্গে ছিল অর্থ সম্পদের প্রতি চরম উদাসীনতা। একবার তার বন্ধু অ্যালসিবিয়াদেশ তাকে বাসস্থান তৈরি করার জন্য বিরাট একখ- জমি দিতে চাইলেন।

সক্রেটিস বন্ধুর দান ফিরিয়ে দিয়ে সকৌতুকে বললেন, আমার প্রয়োজন একটি জুতার আর তুমি দিচ্ছ একটি বিরাট চামড়া এ নিয়ে আমি কী করব জানি না। পার্থিব সম্পদের প্রতি নিস্পৃহতা তার দার্শনিক জীবনে যতখানি শান্তি নিয়ে এসেছিল, তার সাংসারিক জীবনে ততখানি অশান্তি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তার প্রতিও তিনি ছিলেন সমান নিস্পৃহ। তার স্ত্রী জ্ঞ্যানথিপি ছিলেন ভয়ংকর রাগী মহিলা। সাংসারিক ব্যাপারে সক্রেটিসের উদাসীনতা তিনি মেনে নিতে পারতেন না। একদিন সক্রেটস গভীর একাগ্রতার সঙ্গে একখানি বই পড়ছিলেন। প্রচ- বিরক্তিতে জ্ঞ্যানথিপি গালিগালাজ শুরু করে দিলেন। কিছুক্ষণ সক্রেটিস স্ত্রীর বাক্যবাণে কর্ণপাত করলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ধৈর্য রক্ষা করতে না পেরে বাইরে গিয়ে আবার বইটি পড়তে আরম্ভ করলেন। জ্ঞ্যানথিপি আর সহ্য করতে না পেরে এক বালতি পানি এনে তার মাথায় ঢেলে দিলেন। সক্রেটিস মৃদু হেসে বললেন, আমি আগেই জানতাম যখন এত মেঘগর্জন হচ্ছে তখন শেষ পর্যন্ত একপশলা বৃষ্টি হবেই। জ্ঞ্যানথিপি ছাড়াও সক্রেটিসের আরও একজন স্ত্রী ছিলেন, তার নাম মায়ার্ত ।

দুই স্ত্রীর গর্ভে তার তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। দারিদ্র্যের মধ্যে হলেও তিনি তাদের ভরণপোষণ শিক্ষার ব্যাপারে কোনো উদাসীনতা দেখাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শিক্ষার মধ্যেই মানুষের অন্তরের জ্ঞানের পূর্ণ জ্যোতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জ্ঞানের মধ্যে দিয়েই মানুষ একমাত্র সত্যকে চিনতে পারে।

তিনি চাইতেন মানুষের মনের সেই অজ্ঞানতাকে দূর করে তার মধ্য বিচার বৃদ্ধি বোধকে জাগ্রত করতে। যাতে তারা সঠিকভাবে নিজেদের কর্মকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে।’ কহড়ি ঃযুংবষভ ‘এই উক্তির জন্য অমর হয়ে আছেন সক্রেটিস, যার অর্থÑ ‘নিজেকে জানো।’ সত্যিই নিজেকে জানলেই তবে অন্য কিছু সম্পর্কে জানা সম্ভব। তার লক্ষ্য ছিল আলোচনা জিজ্ঞাসা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে সেই সত্যকে উপলব্ধি করতে মানুষকে সাহায্য করা। কথার মধ্য দিয়ে তর্ক বিচারের পদ্ধতিকে দার্শনিকরা আস্তি নাস্তিমূলক পদ্ধতি নাম দিয়েছেন, সক্রেটিস এই পদ্ধতির সূত্রপাত করেছিলেন।

পরবর্তীকালের তার শিষ্য প্লেটো, প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটল সেই ধারাকে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত করেছিলেন ন্যায় শাস্ত্রে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শেষ ভাগ থেকে পঞ্চম শতাব্দীর শেষার্ধ পর্যন্ত গ্রিক সভ্যতার স্বর্ণযুগ। এই যুগেই সক্রেটিসের জন্ম। কিন্তু তার যৌবনকাল থেকে এই সভ্যতার অবক্ষয় শুরু হলো। পরস্পরের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধবিগ্রহের ফলে প্রত্যেকেরই প্রভাব-প্রতিপত্তি কমতে আরম্ভ করল। গ্রিসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র এথেন্সও তার প্রভাব থেকে বাদ পড়ল না। শুধু অর্থনীতি নয়, সমাজ রাজনীতিতেও নেমে এলো বিপর্যয়। তর্কের মধ্যে দিয়ে আলোচনার পথ ধরে মানুষের মধ্যে চিন্তার উন্মেষ ঘটানো, সত্যের পথে মানুষকে চালিত করা।

সক্রেটিসের আদর্শকে দেশের বেশ কিছু মানুষ সুনজরে দেখেনি। তারা সক্রেটিসের সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা করল। তাছাড়া যারা ঐশ্বর্য, বীরত্ব শিক্ষার অহংকারে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করত, সক্রেটিসের মুখোমুখি দাঁড়ালে তাদের এই অহংকারের খোলসটা খসে পড়ত। এভাবে নিজেদের স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়ে পড়ায় অভিজাত শ্রেণির মানুষরা সক্রেটিসের ঘোর বিরোধী হয়ে উঠল। তাদের চক্রান্তে দেশের নাগরিক আদালতে সক্রেটিসের ঘোর বিরোধী অভিযোগ আনা হলো তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তিনি এথেন্সের প্রচলিত দেবতাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে নতুন দেবতার প্রবর্তন করতে চাইছেন। দ্বিতীয়ত তিনি দেশের যুবসমাজকে ভ্রান্ত পথে চালিত করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের আরো দুটি কারণ ছিল স্পার্টার সঙ্গে ২৭ বছরের যুদ্ধে এথেন্সের পরাজয়ের ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরাট আঘাত এলো। অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিল।

সেকালের ধর্মবিশ্বাসী মানুষরা মনে করল নিশ্চয়ই দেবতাদের অভিশাপেই এই পরাজয় আর এর জন্য দায়ী সক্রেটিসের ঈশ্বরবিদ্বেষী শিক্ষা। সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলো মেলেতুল, লাইকন, আনাতুস নামে এথেন্সের তিনজন সম্ভ্রান্ত নাগরিক। এই অভিযোগের বিচার করার জন্য আলোচোনের সভাপতিত্বে ৫০১ জনের বিচারকম-লী গঠিত হলো। এই বিচারকম-লীর সামনে সক্রেটিস এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার বিরোধীপক্ষ কী বলেছিল তা জানা যায়নি। তবে সক্রেটিসের জবানবন্দি লিখে রেখে গিয়েছিলেন প্লেটো। এক আশ্চর্য সুন্দর বর্ণনায়, বক্তব্যের গভীরতায় এই রচনা বিশ্ব সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

‘হে এথেন্সের অধিবাসীগণ, আমার অভিযোগকারীদের বক্তৃতা শুনে আপনাদের কেমন লেগেছে জানি না, তবে আমি তাদের বক্তৃতার চমকে আত্মবিস্মৃত হয়েছিলাম, যদিও তাদের বক্তৃতায় সত্য ভাষণের চিহ্নমাত্র নেই। এর উত্তরে আমার বক্তব্য পেশ করছি। আমি অভিযোগকারীদের মতো মার্জিত ভাষার ব্যবহার জানি না। আমাকে শুধু ন্যায়বিচারের স্বার্থে সত্য প্রকাশ করতে দেওয়া হোক।

কেন আমি আমার দেশবাসীর বিরাগভাজন হলাম? অনেক দিন আগে ডেলফির মন্দিরে দৈববাণী শুনলাম তখনই আমার মনে হলো এর অর্থ কী? আমি তো জ্ঞানী নই তবে দেবী কেন আমাকে দেবীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলল এই দেখ আমার চেয়ে জ্ঞানী মানুষ। আমি জ্ঞানী মানুষ খুঁজতে আরম্ভ করলাম। ঠিক একই জিনিস লক্ষ্য করলাম। সেখান থেকে গেলাম কবিদের কাছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম তারা প্রকৃতই অজ্ঞ। তারা ঈশ্বরদত্ত শক্তি ও প্রেরণা থেকেই সবকিছু সৃষ্টি করেন, জ্ঞান থেকে নয়।

শেষ পর্যন্ত গেলাম শিল্পী, কারিগরদের কাছে। তারা এমন অনেক বিষয় জানেন যা আমি জানি না। কিন্তু তারাও কবিদের মতো সব ব্যাপারেই নিজেদের চরম জ্ঞানী বলে মনে করত আর এই ভ্রান্তিই তাদের প্রকৃত জ্ঞানকে ঢেকে রেখেছিল। এই অনুসন্ধানের জন্য আমার অনেক শত্রু সৃষ্টি হলো। লোকে আমার নামে অপবাদ দিল, আমিই নাকি একমাত্র জ্ঞানী কিন্তু ততদিনে আমি দৈববাণীর অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেছি। মানুষের জ্ঞান কত অকিঞ্চিৎকর। দেবতা আমার নামটা দৃষ্টান্তস্বরূপ ব্যবহার করে বলতে চেয়েছিলেন তোমাদের মধ্যে সেই সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী যে সক্রেটিসের মতো জানে, যে সত্য সত্যই জানে আর জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই। আমি নিশ্চিত যে আমি অনেকের অপ্রিয়তা এবং শত্রুতা অর্জন করেছি এবং আমার চরম দ- হলে এই শত্রুতার জন্যই হবে, মেলেতুস বা আনিতুসের জন্য নয়। দ- হলে তা হবে জনতার ঈর্ষা ও সন্দেহের জন্য যা আমার আগে অনেক সৎকারের নিধনের কারণ হয়েছে এবং সম্ভবত আরও অনেকের নিধনের কারণ হবে।

আমিই যে তাদের শেষ বলি তা মনে করার কোনো কারণ নেই।Ñ অতএব হে এথেন্সের নাগরিকগণ, আমি বলি তোমরা হয় আনিতুসের কথা শোন অথবা অগ্রাহ্য কর। হয় আমাকে মুক্তি দাও নয়তো দিও না, কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পার আমি আমার জীবনের ধারা বদলাব না।Ñবন্ধুগণ, সম্ভব অসম্ভবের কথা বাদ দিয়ে বলছি মুক্তিলাভের জন্য বা দ- এড়ানোর জন্য বিচারকদের অনুনয় করা অসঙ্গত। যুক্তি পেশ করে তাদের মনে প্রত্যয় জন্মানোই আমাদের কর্তব্য, বিচারকের কর্তব্য হচ্ছে ন্যায়বিচার করা। বিচারের নামে বন্ধু তোষণ করা নয়।

-আমি দেবতাকে বিশ্বাস করি, আমার অভিযোগকারীরা যতখানি বিশ্বাস করে তার চেয়েও অনেক বেশি বিশ্বাস করি। এতক্ষণ আমি ঈশ্বর এবং তোমাদের সামনে আমার বক্তব্য রাখলাম। এবার তোমাদের এবং আমার পক্ষে যা সর্বোত্তম সেই বিচার হোক। ’

বিচারে ২৮১-২২০ ভোটে সক্রেটিসকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। সেই যুগে এথেন্সে কোনো অভিযুক্তকে দোষী ঘোষণা করা হলে তাকে দুটি শাস্তির মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো। কিন্তু সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন তিনি নির্দোষ, তাই রায় ঘোষিত হওয়ার পর তিনি উত্তর দিলেন, হে এথেন্সের অধিবাসীগণ, আমার পক্ষ থেকে কি পাল্টা দ- প্রস্তাব করব? আমার যা ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্য তাই নয় কি? আমি তোমাদের প্রত্যেকের কাছে ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছি, সে শুধু তোমাদের কল্যাণের জন্য। এভাবে আমি তোমাদের উপকার করতে চেয়েছি। উপকারীকে সরকারি ব্যয় ভরণপোষণের ভার গ্রহণ করা হোক এই আমার শেষ ইচ্ছা। সক্রেটিসের এই বক্তব্যে জুরিরা আরো ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। তাদের ধারণা হলো সক্রেটিস তাদের ব্যঙ্গ করছেন। আরও অনেকে তার বিরুদ্ধে চলে গেল এবং বিচারে তার মৃত্যুদ- দেওয়া হলো। তার মৃত্যুদ- ঘোষিত হলে তিনি বিচারকদের উদ্দেশে বললেন, ‘ও ঃড় ফরব, ুড়ঁ ঃড় ষরাব যিরপয রং নবঃঃবৎ ড়হষু এড়ফ শহড়ংি’ সেই ভয়ংকর রায় শুনে এতটুকু বিচলিত হলেন না সক্রেটিস।

স্থির শান্তভাবে বললেন, এখন সময় হয়েছে আমাদের সকলকে চলে যাওয়ার, তবে আমি যাব মৃত্যুর দিকে, তোমরা যাবে জীবনের দিকে। জীবন কিংবা মৃত্যু-একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারেন এর মাঝে শ্রেষ্ঠ কে? সক্রেটিসের বন্ধুদের মধ্যে ক্রিটো ছিলেন সবচেয়ে ধনী। তিনি কারারক্ষীদের ঘুষ দিয়ে সক্রেটিসকে অন্য দেশে পালিয়ে যেতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন দেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই দেশের আইনশৃঙ্খলা মেনে চলা কর্তব্য। বিচারালয়ের আদেশ উপেক্ষা করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার অর্থ আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। তাছাড়া এতে সকলের মনে এই ধারণা হবে যে সক্রেটিস সত্যি সত্যিই অপরাধী। তাকে দোষী সাব্যস্ত করে বিচারকরা ঠিক কাজই করেছেন। মৃত্যুর দিন সকল শিষ্য একে একে উপস্থিত হলেন কারাগারে। তিনি গোসল করে ফিরে এলেন। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। মুহূর্তে মৃত্যুদূতের মতো দ্বারে এসে দাঁড়াল জেলের কর্মচারী।

গভীর বেদনায় কাঁদতে কাঁদতে ঘোষণা করল সক্রেটিসের বিষপানের সময় হয়েছে। ক্রিটো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজকর্মচারীর দিকে ইঙ্গিত করতেই জল্লাদ কক্ষে প্রবেশ করল, হাতে তার হেমলক পাতার রসের বিষের পাত্র। সক্রেটিস হাসিমুখে সেই পাত্র নিজের হাতে তুলে নিলেন। অকল্পিতভাবে শেষবারের মতো ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন তারপরই সমস্ত বিষ পান করলেন। তারপর জল্লাদের নির্দেশে ঘরের মধ্যে হাঁটতে আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে বিষ তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। পা দুটো ভারী হয়ে এলো। চলৎশক্তিহীন হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কাপড়ে মুখ ঢেকে দিলেন। কয়েক মুহূর্ত সব শান্ত। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সক্রেটিস যাত্রা করলেন অমৃতলোকে। তার মৃত্যুর পরেই এথেন্সের মানুষ ক্ষোভে দুঃখে ফেটে পড়ল।

চারদিকে ধিক্কার ধ্বনি উঠল। বিচারকদের দল সর্বত্র একঘরে হয়ে পড়ল। অনেকে অনুশোচনায় আত্মহত্যা করলেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে মেনেতুসকে পিটিয়ে মারা হলো, অন্যদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হলো। দেশের লোকেরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিরাট মূর্তি প্রতিষ্ঠা করল। কিন্তু মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার নশ্বর দেহের শেষ হলেও চিন্তার শেষ হয়নি। তার শিষ্য প্লেটো, প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটলের মধ্য দিয়ে সেই চিন্তার এক নতুন জগৎ সৃষ্টি হলো। সক্রেটিস এই বিশ্বজগতের নিগূঢ় রহস্য নিয়ে আলোচনার চেয়ে জীবন ও সমাজের বাস্তব বিষয়াদি নিয়ে আলোচনায়ই তিনি ছিলেন বেশি আগ্রহী। যেমন, সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? মানুষের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব কিসে নিহিত? এ জাতীয় জীবনধর্মী প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানই ছিল তার চিন্তার অগ্রাধিকার। সক্রেটিসই পৃথিবীর প্রথম দার্শনিক ও চিন্তাবিদ যাকে তার চিন্তা ও দর্শনের জন্য মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!