× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সালমান ফরিদ, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৫:৫৮ এএম

মহাকালে বৃহস্পতি : শিক্ষায় সংকট, আতঙ্ক ও উত্তরণ

সালমান ফরিদ, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৫:৫৮ এএম

মহাকালে বৃহস্পতি : শিক্ষায় সংকট, আতঙ্ক ও উত্তরণ

শিক্ষা যেকোনো জাতির মেরুদ- এবং সামষ্টিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক অভূতপূর্ব ও বহুমাত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই রূপান্তর যেমন কিছু সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, ঠিক তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বে গভীর সংকট ও এক ধরনের ‘শিক্ষা আতঙ্ক’ তৈরি করেছে। নীতি নির্ধারকদের ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, মাঠপর্যায়ের অবকাঠামোগত শূন্যতা এবং শিক্ষার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণÑ সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা এক চরম অনিশ্চিত গোলকধাঁধায় পড়েছেন।

শুরুতেই বলে রাখা ভালো, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যত বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, তা পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখা যায়। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করার পর শিক্ষকেরা যখন বছরের পর বছর ধরে তা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই তা আংশিক পরিবর্তন করে জেএসসি-পিইসির মতো পাবলিক পরীক্ষা চালু করা হয়। আবার কয়েক বছর পর কোনো সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন ছাড়াই সেই পরীক্ষাগুলো বাতিল করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩-২৪ সাল থেকে যোগ্যতাভিত্তিক নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হয়, যেখানে প্রথাগত পরীক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও প্রজেক্টভিত্তিক কাজের ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এসে আবার মূল্যায়নের পদ্ধতিতে বড় ধরনের ওলটপালট এবং লিখিত পরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই যে ঘন ঘন শিক্ষানীতি ও মূল্যায়ন পদ্ধতির বদল, এতে সবচেয়ে বড় বলির পাঁঠা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তারা নিজেদের এক ধরনের ‘ল্যাবরেটরি গিনিপিগ’ মনে করছে। অভিভাবকরা বুঝতে পারছেন না তাদের সন্তানকে তারা কীভাবে গাইড করবেন। কোনো একটি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা যে পদ্ধতিতে পড়াশোনা শুরু করছে, বছর শেষে দেখা যাচ্ছে মূল্যায়নের নিয়ম বদলে গেছে।

অনেক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, যেখানে একেকটি বেঞ্চে গাদাগাদি করে ৫-৬ জন শিক্ষার্থীকে বসতে হয়। নতুন কারিকুলামে যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারিক কাজের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, সেখানে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কোনো কার্যক্ষম বিজ্ঞানাগার কিংবা কম্পিউটার ল্যাব নেই। এমনকি অনেক বিদ্যালয়ে বৃষ্টির দিনে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়।

এর চেয়েও ভয়াবহ সংকট হলোÑ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব। নতুন যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম পরিচালনার জন্য শিক্ষকদের যে ধরনের উচ্চতর মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন, তা রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। নামমাত্র ৩ বা ৫ দিনের দলগত কর্মশালা দিয়ে শিক্ষকদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গণিত বা বিজ্ঞানের শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষককে সেই ক্লাস নিতে হচ্ছে। শিক্ষকেরা যখন নিজেরা পদ্ধতিটি বুঝতে পারছেন না, তখন তারা শিক্ষার্থীদের গাইড বই বা কোচিং সেন্টারের দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর পাশাপাশি ডিজিটাল ক্লাসরুম ও অনলাইন শিক্ষার প্রসারের একটি দারুণ ইতিবাচক দিক ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিক্ষার জন্য অন্যতম বড় হুমকি বা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। চ্যাটজিপিটি বা বিভিন্ন এআই টুলের সহজলভ্যতার কারণে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতা মারাত্মকভাবে লোপ পাচ্ছে। বিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট বা কোনো লেখার কাজ দিলে শিক্ষার্থীরা নিজেরা বই পড়ে বা চিন্তা করে তা না লিখে, সরাসরি ইন্টারনেট থেকে কপি-পেস্ট করছে। ফলে তাদের মৌলিক লিখন শৈলী এবং গবেষণাধর্মী মানসিকতা গড়ে উঠছে না।

স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ বা দীর্ঘসময় কোনো বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

অন্যদিকে শিক্ষা আজ আর কেবল একটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন অন্যতম লাভজনক একটি বড় পুঁজিতে পরিণত হয়েছে।

এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাস করেছে। বিভিন্ন সময়ে ওঠা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং পরীক্ষার খাতায় অনৈতিকভাবে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মনে এই ধারণার জন্ম দিচ্ছে যেÑ যোগ্যতা বা পড়াশোনা নয় বরং টাকা ও ক্ষমতার জোরেই সবকিছু সম্ভব। এই নৈতিক স্খলন একটি প্রজন্মের মেরুদ-কে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থার এই বহুমাত্রিক পচন এবং সমাজব্যাপী আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে হলে কোনো জোড়াতালির সিদ্ধান্ত বা খ-কালীন সংস্কারে কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, স্বাধীন ও যুগোপযোগী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। কী হতে পারে সেসব পরিকল্পনা? আসুন, কয়েকটি পয়েন্টে আলোচনা করা যাক।

ক. জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন ও শিক্ষানীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনা শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাব ও বারবার নীতি পরিবর্তনের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

যেকোনো নতুন পদ্ধতি বা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া দেশব্যাপী চালু করার আগে, অন্তত দুই থেকে তিন বছর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে ‘পাইলটিং’ করতে হবে।

খ. শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ

যেকোনো উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি হলোÑ শিক্ষক। ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশে মেধার দিক থেকে সেরা ব্যক্তিরা শিক্ষকতা পেশায় আসেন, কারণ সেখানে শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক এবং আকর্ষণীয় বিশেষ বেতন কাঠামো প্রবর্তন করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির মেধাবীরা স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেন। তবে শিক্ষকদের জন্য নামমাত্র বা দায়সারা প্রশিক্ষণ বন্ধ করতে হবে। সারা বছরজুড়ে প্রতিটি শিক্ষকের জন্য ‘ইন-সার্ভিস ট্রেনিং’ বা পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

গ. শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য দূরীকরণ

শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের বর্তমান বাজেট বরাদ্দ বৈশ্বিক মানদ- তো বটেই, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের মোট জিডিপির (এউচ) অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত। সরকারকে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

এই বরাদ্দের সিংহভাগ মেগা প্রজেক্টের মতো করে মফস্বল, চরাঞ্চল ও হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে।

ঘ. প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও নৈতিক শিক্ষার পুনর্বিন্যাস

প্রযুক্তির জোয়ারকে আমরা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারব না, তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে এর নিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবহার শেখাতে হবে। বিদ্যালয়ে প্রযুক্তির ব্যবহারকে কেবল প্রজেক্টর বা স্ক্রিন দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার ও ‘সাইবার হাইজিন’ বা সচেতনতা সম্পর্কে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এআইকে ফাঁকি দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে না দেখে, কীভাবে একে নিজের শেখার গতি বাড়ানোর সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করা যায় (যেমনÑ  প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং বা ক্রিয়েটিভ থিংকিং), তা শেখাতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন ভালো ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। তাই পাঠ্যবইয়ে শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে নৈতিকতা, সততা, দেশপ্রেম, পরমতসহিষ্ণুতা এবং শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের মতো মানবিক বিষয়গুলোকে গল্পের ছলে ও বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে।

সারকথা, শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান সংকট ও আতঙ্কগুলো একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এর সমাধানও জাদুমন্ত্রের মতো রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে এটিকে আর অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই; কারণ শিক্ষার পতন মানে একটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!