আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপনকালে এ তথ্য জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করছি।’
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রথম ১০ মাসে অর্থাৎ, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি চলতি অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত থেকেই যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন ঘাটতির মধ্যে এনবিআরের ওপর আগামী অর্থবছরে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আগের চেয়ে আরও ১ লাখ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। তবে টানা ব্যর্থতার পরেও রাজস্ব আদায়ের নতুন লক্ষ্যবৃদ্ধিকে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বিদায়ি অর্থবছরের মূল বাজেটে এই খাত থেকে ৪৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। তবে সংশোধিত বাজেটে সেই লক্ষ্য বাড়িয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। নতুন বাজেটে সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়ে আরও ১ হাজার কোটি টাকা বেশি আয়ের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
তবে নতুন এই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যÑ ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বড় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেট অনুসারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি যেখানে তিন বছর ধরে ৪ শতাংশের আশপাশে। বিশ্বব্যাংকও আগামী অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বছরে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে। অর্থাৎ, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর অন্যতম কৌশল হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের চেয়ে এটি ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ৩ লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বাজেট বাড়িয়েছে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে আয় বাড়াতে হবে, অর্থাৎ রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য।
এদিকে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর-বহির্ভূত (নন-ট্যাক্স) রাজস্ব থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এটি বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি।
নতুন পরিকল্পনায় যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককেই বহন করতে হবে। আগামী অর্থবছরেই ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করতে চায় সরকার। অথচ বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের সবাই নিয়মিত ভ্যাট দেয় না। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয়।
অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, করের পরিবর্তে এসব উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর অর্থ হলো জনগণকে বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের সময় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। কারণ পাসপোর্ট, লাইসেন্স, নিবন্ধন, টোল বা বিভিন্ন সেবার ফি বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি নাগরিকদের ওপর পড়ে।
এ ছাড়া সরকারি ঋণের সুদ থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হবে। সরকার বিভিন্ন সংস্থা ও প্রকল্পকে যে ঋণ দিয়েছে, তার বিপরীতে ৫ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা সুদ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। পাসপোর্ট, ভিসা, কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবার ফি থেকে ৫ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে জরিমানা, দ- ও বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে আসবে ৬৮৮ কোটি টাকা। টেলিযোগাযোগ, ডাক, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি সেবা থেকে ৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা নন-ট্যাক্স রাজস্বের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত।
এ ছাড়া সরকারি জমি, ভবন ও অন্যান্য সম্পত্তি ভাড়া ও ইজারা দিয়ে ৬৩০ কোটি টাকা এবং সেতু, মহাসড়ক ও টানেলের টোল থেকে ১ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। সরকারি প্রকাশনা, পুরোনো যানবাহন, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য অব্যবহৃত সম্পদ বিক্রি করে ৩ হাজার ৫১২ কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
রয়্যালটি, লাইসেন্স ফি, খনিজ ও জ¦ালানি সম্পদ ব্যবহারের চার্জ এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়সহ অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন