× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

পারভেজ খান

প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৫:১১ এএম

রম্য প্রতিবেদন

প্রতি ম্যাচে ৫ কোটি নতুন রেফারি

পারভেজ খান

প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৫:১১ এএম

প্রতি ম্যাচে ৫ কোটি নতুন রেফারি

যে জ্বরের কোনো ওষুধ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানও আজ পর্যন্ত খুঁজে বের করতে পারেনি এই জ্বরের কারণ, সেই জ্বরে কাঁপতে শুরু করেছে পুরো পৃথিবী। বাংলাদেশ সময় গত রাত ১টা থেকেই এই জ্বরের নাচুনি, কাঁপুনি, ঝাঁকুনি শুরু। এই জ্বরের কোনো ভ্যাকসিন নেই, কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, আর এবার এই জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে টানা ১৯ জুলাই পর্যন্ত ভুগতে হবে কঠিন তাপমাত্রা নিয়ে। পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আরও কদিন বেশিও লাগতে পারে। আবার কারও কারও মধ্যে এই জ্বরের ট্রমা থেকে যায় অনেক দিন, অনেক বছরও। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো বইয়ে এর নাম না থাকলেও কোটি কোটি মানুষ বহুদিন ধরেই এই রোগকে চেনে। এর নাম বিশ্বকাপ জ্বর। অনেকে বলেন, ফুটবল-ভূতে পাওয়া। কেউ কেউ আবার এই জ্বরকে ঝড় বা সাইক্লোন বলেও সম্বোধন করে।

এই জ্বরে একই সময়ে কোটি কোটি মানুষ একই সঙ্গে হাসবে, কাঁদবে, চিৎকার করবে, হতাশ হবে, আবার আশায় বুক বাঁধবে। কেউ নতুন নায়ক খুঁজে পাবে, কেউ পুরোনো স্বপ্ন ভাঙতে দেখবে। কেউ বলবে, এবার আমাদের বছর। আবার কেউ ম্যাচ শেষে বলবে, রেফারির পক্ষপাত না থাকলে আমরা জিততাম। একজন বলছেন, মেসি না থাকলে আর্জেন্টিনা কিছুই না। আরেকজন বলে ওঠেন, ব্রাজিলের বেঞ্চেই এমন খেলোয়াড় আছে, যাদের দেখে তোমাদের প্রথম একাদশ ভয় পায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলো ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি অবস্থানে চলছে। বিশ্বকাপ শুরু হওয়া মাত্রই মানুষের আচরণে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। বিশ্বকাপ চলাকালে একজন সাধারণ মানুষও হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষকে পরিণত হন। যিনি সারা বছর নিজের এলাকার ক্লাবের নামও জানেন না, তিনিই রাতারাতি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা জার্মানির ট্যাকটিকস নিয়ে দীর্ঘ ভাষণ দিতে শুরু করেন। যিনি জীবনে কখনো ফুটবলে পা দেননি, তিনিও বলছেন, ‘৪-৩-৩ ফরমেশনে মিডফিল্ড প্লেসিং ঠিক না হলে সমস্যা হবেই।’

বিশ্বকাপের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে ঘুমের ওপর। সাধারণত রাত ১১টার পর যারা মোবাইল ফোন হাতে ঘুমিয়ে পড়েন, তারাও এই এক মাস নিশাচর প্রাণীতে রূপান্তরিত হন। রাত ৩টা পর্যন্ত খেলা দেখে সকাল ৮টায় অফিসে গিয়ে হাই তোলেন, তারপর দাবি করেন, তারা পুরোপুরি সতেজ। আর প্রেমিক-প্রেমিকারা? রাত জেগে যারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলতেন, তারা মোবাইল ফোনের সুইচ বন্ধ রেখে এখন রিমোট কন্ট্রোল হাতে টিভিমুখী। এই প্রজাতির প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না জানা নেই। নিলে নিতেও পারে। কেননা, তাদের আয় কমে যাবে।

পারিবারিক সম্পর্কেও বিশ্বকাপ বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সংসারজীবনে এই বিশ্বকাপের প্রভাব গুরুতর। বিশ্বকাপের আগে যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথাবার্তা সীমিত ছিল, সেখানে হঠাৎ করেই শুরু হয় কৌশলগত জোট। একজন স্ত্রী স্বামীকে বলেন, ‘তুমি খেলা দেখো, আমি চা বানাচ্ছি।’ পরদিন একই স্ত্রী জানতে চান, ‘আচ্ছা, ওই যে ১০ নম্বর জার্সি পরা ছেলেটা, ও কি ভালো খেলে?’ উত্তরে স্বামীর চোখে যে আনন্দের অশ্রু দেখা যায়, তা সাধারণত বিবাহবার্ষিকীতেও দেখা যায় না। আবার এমনটাও ঘটে, কোনো পরিবারে খেলা চলাকালে দেখা গেল  স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার কথা শুনছ?’ স্বামী টিভির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হুম।’ পাঁচ মিনিট পরে স্ত্রী জানতে পারেন, তিনি আসলে প্রশ্নটাই শোনেননি। অন্যদিকে ম্যাচের শেষ মিনিটে স্ত্রী যদি রাগে-অভিমানে ওয়াই-ফাই বন্ধ করে দেন, তাহলে সেটা অনেকের কাছে বৈবাহিক জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাব দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ম্যাচ শুরুর আগে সবাই নিজেদের দলকে অপরাজেয় ঘোষণা করেন। ম্যাচের ১০ মিনিটের মধ্যেই কেউ লেখেন, ‘আজ ৫ গোল হবেই।’ ২০ মিনিট পরে আরেকজন লেখেন, ‘কৌশল বদলানো দরকার।’ হাফটাইমে সবাই কোচকে বরখাস্ত করেন। ম্যাচ শেষে আবার নতুন পরিকল্পনা দেন। ফলে একেকটি ম্যাচে পৃথিবীতে অন্তত ৫ কোটি নতুন কোচের জন্ম হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে পতাকা ব্যবসায়ীরাও বিশ্বকাপকে বছরের শ্রেষ্ঠ উৎসব হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, বিশ্বকাপ না থাকলে তাদের এই রমরমা ব্যবসা হতো না। বিশ্বকাপ হলে সমর্থকেরা নানান দেশের পতাকা কেনেন। ব্যবসার জন্য এটা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পাড়ায় পাড়ায় ইতোমধ্যে পতাকাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। কোথাও আর্জেন্টিনার পতাকা পাঁচতলা ছুঁয়েছে, কোথাও ব্রাজিলের পতাকা বিদ্যুতের খুঁটি পেরিয়ে মেঘের দিকে রওনা দিয়েছে। সাধারণত দিনে নিজের ঘরের পর্দা ঠিক করতে আলসেমি লাগে যাদের, তারাও এই বিশ্বকাপে ৪০ ফুট বাঁশের মাথায় অথবা ছাদে উঠে ৬০ ফুট পতাকা লাগিয়ে ফেলেছেন। এমন পতাকা উড়ছে যে, অনেক সময় পাখিরাও বিভ্রান্ত হতে পারে। বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন বিমানচালকেরাও। দেখা গেল, এক পাইলট তার কো-পাইলটকে বলছেনÑ এটা ব্রাজিল, নাকি নতুন কোনো দেশ? পথ ভুল করলাম নাকি?

বিশ্বকাপ ঘিরে খাদ্যাভ্যাসেও আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। রাত ১টার ম্যাচ মানেই চা। রাত ৩টার ম্যাচ মানেই কফি। অতিরিক্ত উত্তেজনার ম্যাচ হলে সঙ্গে থাকে চানাচুর, বাদাম, চিপস, বিরিয়ানি, কাবাব এবং অজানা উৎসের বিভিন্ন নাশতা। পুষ্টিবিদেরা এ সময় পরামর্শ দিলেও কেউ শোনেন না। কারণ, তারা নিজেরাও এই একই জ্বরে আক্রান্ত। এছাড়া বিশ্বকাপের মৌসুমে ক্যালরির চেয়ে গোলের গুরুত্ব অনেক বেশি।

এদিকে অর্থনীতিবিদদের একাংশ দাবি করেছেন, বিশ্বকাপের সময় পৃথিবীর উৎপাদনশীলতা সামান্য কমে যায়, কিন্তু আনন্দের উৎপাদন কয়েকশ গুণ বেড়ে যায়। তাদের ভাষায়, মানুষ অফিসে কাজ কম করলেও আলোচনা বেশি করে। ফলে জিডিপি না বাড়লেও গল্পের জিডিপি ব্যাপক বাড়ে।

দেশের অফিসগুলোও এই সময়ে এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বস মিটিং ডাকেন। কর্মচারীরা রিপোর্ট নিয়ে নয়, অফসাইড নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। একজন বলেন, ‘স্যার, ফাইলটা কাল দেব।’ বস জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন?’ উত্তর আসে, ‘স্যার, কালকে ম্যাচ ছিল।’ বস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, ‘ঠিক আছে। কিন্তু রেফারির সিদ্ধান্তটা আপনার কাছে কেমন লেগেছে?’

পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলবে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। একজন বলবেন, ‘মেসি ফুটবলের রবীন্দ্রনাথ।’ অন্যজন সঙ্গে সঙ্গে বলবেন, ‘তাহলে নেইমার কী?’ তৃতীয়জন উত্তর দেবেন, ‘নেইমার হচ্ছে শাকিব খান!’ তারপর আধঘণ্টা ধরে তর্ক হবে রবীন্দ্রনাথ ভালো, না শাকিব খান? ফুটবলের আলোচনা কখন যে সাংস্কৃতিক আর সাহিত্য সম্মেলনে ঢুকে পড়ে, কেউ টের পায় না।

মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ সমর্থক ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনায় যাননি; কিন্তু বিশ্বকাপের সময় তাদের আবেগ দেখে মনে হয়, দলের গোল হজম করলে পারিবারিক সম্পত্তির ভাগ কমে যাবে।

অনেকে এগুলোকে ভূতে ধরাও বলে থাকেন। যে ভূতের শিং নেই, লেজ নেই, এমনকি ভয় দেখানোরও বিশেষ অভ্যাস নেই, সেই ভূতই প্রতি চার বছর পরপর পৃথিবী দখল করে নেয়। বিশ্বকাপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই এই ভূত প্রথমে ঢুকে পড়ে মানুষের ড্রইংরুমে, তারপর শোবার ঘরে, অফিসে, স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, চায়ের দোকানে, এমনকি সংসদ ভবনের আশপাশেও। কোথাও তার ভিসা লাগে না, পাসপোর্ট লাগে না। বিমান ভাড়াও দিতে হয় না। এক বলের পেছনে চড়ে সে মুহূর্তেই মহাদেশ পেরিয়ে যায়। বাংলাদেশে এই ভূতের প্রভাব সবচেয়ে নাটকীয়। যে মানুষ সারা বছর নিজের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নাম মনে রাখতে পারেন না, তিনিই হঠাৎ ব্রাজিলের রাইট-ব্যাক বা আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করেন।

তার পরও মনে হয়, এই দেশটা আসলে অদ্ভুত সুন্দর। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে খেলা হচ্ছে, অথচ উত্তেজনায় কাঁপছে বাংলাদেশের প্রতিটি অলিগলি, চায়ের দোকান, ছাদ, বারান্দা আর ড্রইংরুম থেকে শুরু করে অফিস পর্যন্ত। যে লোক জীবনে কোনো দিন আর্জেন্টিনায় যাননি, ব্রাজিলেও না, পাসপোর্ট পর্যন্ত নেইÑ তিনিও দলের হার দেখে এমন কাঁদেন, যেন তার তিনতলা বাড়ি ধসে পড়েছে। আসলে বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই। এক বলের পেছনে ছুটতে ছুটতে পৃথিবীটাই যেন  কিছুদিনের জন্য নিজের সব বিভেদ ভুলে যায়।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!