বহুমুখী সংকটের কাঁটাতারের ওপর দাঁড়িয়েই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের নতুন বাজেট ঘোষণা করেছে বিএনপি সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে করা দুর্নীতি, অনিয়ম আর অর্থ পাচারের ক্ষত এখনো শুকায়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিগত বছরগুলোয় নেওয়া কঠিন শর্তের বিদেশি ঋণের বোঝা। ঠিক এমন এক ভঙ্গুর ও খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতির হাল ধরেছে তারেক রমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির নতুন সরকার। দলটি সরকারে আসার ঠিক কয়েক দিন পরই শুরু হয় ইরান-ইসরায়েল সংঘাত। এর উত্তাপ আর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা এসে আছড়ে পড়ছে দেশের বাজারেও। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই নতুন সরকারকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে এক চরম অর্থনৈতিক বাস্তবতার।
বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ¦ালানি সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভারসাম্য আনয়ন, সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া এবং দুর্বল আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। যেখানে শুধু উচ্চাভিলাষী ব্যয়ই নয়, একইভাবে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। তার পরও বাজেটে রেকর্ড পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে।
যেখানে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি, সে হিসাবে এবার বাজেটের আকার বাড়ানো হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি, যা ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি। অবশ্য সংকট মোকাবিলায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার আগের বছরের (২০২৪-২৫) তুলনায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে বাজেট ঘোষণা করেছিল, যা এখনো ধীরগতিতে বাস্তবায়নাধীন। আগামী বছরের বাজেটের প্রস্তুত করা সারসংক্ষেপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে, যা নিয়ে এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ীই বাজেটের এই সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করেছে অর্থ বিভাগ।
সরকারের প্রস্তুত করা সর্বশেষ বাজেটের খসড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষাজালের সম্প্রসারণ, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ১৩টি ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার, যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। এ খাতের অধীনে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী, যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া এই খাতের আওতার সঙ্গে বাড়ানো হবে উপকারভোগীর সংখ্যাও। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম চলমান থাকবে বছরজুড়ে।
বড় আট চ্যালেঞ্জ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীলতা : সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনাই হবে এই বাজেটের এক নম্বর পরীক্ষা। কারণ দেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের চাহিদা কমতির দিকে। সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব। নতুন বিনিয়োগ কম। চলছে ব্যয় সাশ্রয় ও কর্মী ছাঁটাই। নতুন নিয়োগের সংখ্যা প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়।
রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন : এবারের বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারণ, কাক্সিক্ষত মাত্রায় রাজস্ব আদায় করা না গেলে বাজেটের বিশাল ব্যয় মেটানো অসম্ভব। ফলে করজাল সম্প্রসারণ ও রাজস্ব আহরণে গতি আনা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে উত্তরণ : সংকটকালীন নেওয়া সরকারের কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন বা ব্যয় সংকোচন নীতি দীর্ঘমেয়াদে চললে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। তাই এই নীতি থেকে ধীরে ধীরে ও সুপরিকল্পিতভাবে বেরিয়ে আসা জরুরি।
ভর্তুকি সামলে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন : গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতের বিপুল ভর্তুকির চাহিদা মেটানো এখন সরকারের জন্য গলার কাঁটা। এই ভর্তুকির চাপ সামলে কীভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অর্থ সঞ্চালন সচল রাখা যায়, তা বড় চিন্তার বিষয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি : মেগা প্রজেক্টসহ অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি এনে অপচয় রোধ করা এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গতিহীনতা ও বৈদেশিক অর্থায়ন হ্রাস : মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল দুই স্তম্ভ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দীর্ঘদিনের। বিগত অর্থবছরের এমন নজির রয়েছে। বিশেষ করে এ দুই খাতে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম লক্ষ করা যাচ্ছে।
বিনিয়োগের পরিবেশ ও কাঠামোগত সংস্কার : দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের খরা কাটাতে আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ঋণ ধারণ সক্ষমতা ও ঋণের স্থিতিশীলতা রক্ষা : বিগত সরকারের নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ এখন পাহাড়সম। দেশের ঋণ ধারণ সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং ঋণের স্থিতিশীলতা রক্ষায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন