রাজনৈতিক অঙ্গীকার মাথায় রেখেই প্রস্তাবিত বাজেট সাজিয়েছে বিএনপি সরকার। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৮০ দিন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের জন্য মেগা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন।
মূল্যস্ফীতির অব্যাহত চাপ এবং দীর্ঘদিনের নানা সংকটে যখন বিপর্যস্ত অর্থনীতি, সেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জনতুষ্টির বাজেট প্রস্তাব করা হলো বলে বলছেন অর্থনীতিবিদেরা। অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং কাজের সুযোগ বা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ে। এই চিন্তা থেকে বড় সুবিধা দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, তারেক রহমানের সরকারের এই প্রথম বাজেটে কর ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবে নতুনত্ব আছে। করের আওতা বাড়ানোর বাড়ানোর ভিত্তি কী হবে, এ নিয়ে লম্বা সময়ের পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে।
চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কর কাঠামোর পরিকল্পনাতেই ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে সুবিধা এবং এক ধরনের নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী, নি¤œআয়ের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি দিতে ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্তত আট ধরনের নতুন কর্মসূচি যুক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রায় চার মাসের মাথায় এটি তাদের প্রথম বাজেট।
বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই অর্থমন্ত্রী এটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির বাজেট বলে উল্লেখ করে বলেন, ফ্যাসিবাদ দেশে অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে, তাতে এর পুনরুদ্ধার ও একে গতিশীল করা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন অর্থাৎ সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে নাÑ বলেন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাবিত এই বাজেটের শিরোনামও করা হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে।
কিন্তু অর্থনীতিবিদের অনেকের দুশ্চিন্তা হচ্ছে, এর বাস্তবায়নের ঝুঁকি নিয়ে। কারণ বিশাল অংকের বাজেটের বড় ঘাটতি মেটাতে নির্ভরতা থাকবে রাজস্ব আয়ের ওপর। সেখানে রাজস্ব আয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা। সেখানে রাজস্ব আয় বাড়ানোটাই বড় চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার মাত্রাও বেড়ে যেতে পারে, সেটিকেও একটা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রাজস্ব আদায়ের সনাতনি পদ্ধতির কথাই এসেছে প্রস্তাবিত বাজেটে। তবে করজাল বা করের আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে। তবে ব্যাংক খাতসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করছেন অর্থনীতিবিদেরা। সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে নানান উদ্বেগ নিয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড : ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’Ñ এ দর্শনে প্রান্তিক ও নি¤œআয়ের পরিবারকে সুরক্ষায় নারীপ্রধান পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে মাসিক আড়াই হাজার টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে। পাইলটিং পর্যায়ে এ পর্যন্ত ৩৬টি ইউনিটের ৬০ হাজার ৪৪টি পরিবারকে এ কার্ড দেওয়া হয়েছে। কৃষকের ইউনিক পরিচয় নিশ্চিতকরণ ও ন্যায্যমূল্যে উপকরণ পেতে গত ১ বৈশাখ (১৪ এপ্রিল ২০২৬) থেকে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০ হাজার ৭৪৮ জনকে এ কার্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাজেটে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সারা দেশের প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ জন কৃষক উপকৃত হবেন।
ই-হেলথ কার্ড ও সম্মানী ভাতা : ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির, ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহার/প্যাগোডা এবং ৩৯৬টি গির্জায় কর্মরত ব্যক্তিবর্গকে মাসিক সম্মানীভাতা দিচ্ছে। পাশাপাশি জনগণকে ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের মধ্যে ৫টি জেলায় (খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী) ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু হবে। এটি ইলেকট্রনিক পেশেন্ট রেফারেল ও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
কর্মসংস্থান ও শিক্ষা খাত : সরকার ৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরে শূন্য পদের বিপরীতে ২ হাজার ৮৭৯ জন নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ এবং পর্যায়ক্রমে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের ২ হাজার ৩৩৬টি কারিগরি ও ৮ হাজার ২৩২টি মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ফ্রি ওয়াই-ফাই’ চালু করা হবে। এছাড়া ল্যাঙ্গুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণসীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে এবং জাপানগামীদের ভিসাপ্রাপ্তি সহজ করা হয়েছে।
পেপ্যাল চালু ও অবকাঠামো উন্নয়ন : দেশে হাই-টেক/সফটওয়্যার পার্কগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং পেপ্যাল কার্যক্রম আরম্ভের উদ্যোগ গ্রহণে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে শহর ও গ্রামে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় যথাক্রমে ৮ বিঘা ও ১০ বিঘা করে উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশ ও বিদ্যুৎ : গত ১৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় ৪টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৬৬৬টি খালের কাজ চলমান, যার মোট দৈর্ঘ্য ৯৬৫.০৪ কিলোমিটার। আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং আসন্ন বর্ষাতেই প্রায় ৩ কোটি ১৪ লাখ চারা রোপণ করা হবে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে।
ক্রীড়া খাতে উন্নয়ন : ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণে ১২-১৪ বছরের শিশু-কিশোরদের জন্য ফুটবল, ক্রিকেটসহ ৮টি খেলা অন্তর্ভুক্ত করে গত ২ মে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ উদ্বোধন করা হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্রীড়া ভাতা চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জনকে এই ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত ৩০০ জনকে ভাতা এবং ৩২৫ জনকে ক্রীড়া কার্ড প্রদান করা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন