ছয় নবজাতকের মৃত্যুর দায়ে অভিযুক্ত হলো আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় অবশেষে বাতিল করা হলো হাসপাতালটির লাইসেন্স। এতে করে এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকল না। যদিও ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। এর আগে গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও বলেন, আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় মন্ত্রণালয়।
গত ২৭ মে ভোরে হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ছয় নবজাতক কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যায়। ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের গাফিলতির একাধিক দিক উঠে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ওয়ার্ডটি নবজাতক ও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীদের জন্য উপযুক্ত ছিল না। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব ছিল এবং এসি ব্যবস্থাও অপ্রতুল ও অনিয়মিতভাবে পরিচালিত হতো। তদন্তে আরও বলা হয়, ঘটনার সময় ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না এবং গুরুতর অবস্থার পরও সময়মতো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে নবজাতকদের শারীরিক অবস্থা জন্মের পর সুস্থ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বলা হয়, প্রসব-পরবর্তী জটিলতার জন্য বিশেষ চিকিৎসা বা ইনকিউবেটরের প্রয়োজনীয়তা ছিল না। তবে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও যথাযথ চিকিৎসা ও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। একই সঙ্গে হাসপাতালের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব এবং প্রশাসনিক ত্রুটির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
লাইসেন্স বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করার দাবি উঠেছে সাধারণ রোগীদের মাঝে। এই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রুম্পা আক্তার বলেন, আমার প্রথম সন্তান জন্মদানের সময় এই হাসপাতালে ভর্তি হয়। এত ছোট কেবিন যে আমার বাসার টয়লেটের সাইজও এর চাইতে বড়। বাতাস ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। দরজা-জানালা বন্ধ একটা কবরস্থান যেন এটি। তাই শুধু চিকিৎসা কার্যক্রম নয় ভবনটিও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা উচিত।
তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই উল্লেখ করে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ^াস রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি আইন অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। আমরা নিয়েছি। এখন ভবনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে করা হয়েছিল কি না তা তারা দেখবে এবং প্রয়োজন হলে পরিত্যক্ত ঘোষণা করবে।
এর আগে এই হাসপাতালের ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত দোষীরা যেন কোনো কারণে ছাড় না পায় তা নিশ্চিতে আইনি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলও। গত সপ্তাহের সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দোষী চিহ্নিত হলে, সে যেন আইনি ফাঁকফোকরের মধ্য দিয়ে পার না পায় সেজন্য আইনগত পরামর্শ দিতে কাজ করবেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে একটি ফৌজদারি মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলমান। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফয়সাল সিদ্দিকী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যাতে আইনি জটিলতা এড়িয়ে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। আর এটিই বাস্তবায়িত হয়েছে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লাইসেন্স বাতিলের কারণে বলা হয়েছে, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় মেডিকেল প্র্যাকটিস এবং প্রাইভেট ক্লিনিক এবং ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ডা. শেখ মহিউদ্দিনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, ২ বড় মগবাজার, ঢাকায় গত ২৭ মে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেডিকেল প্র্যাকটিস এবং প্রাইভেট ক্লিনিক এবং ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ জুন ‘লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না’ বলে ৭ জুনের মধ্যে জবাব প্রদানের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ জুন আপনার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রেরিত চিঠি মোতাবেক কারণ দর্শানোর সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করলে ৯ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়। এতে বলা হয়, পরবর্তীকালে ৯ জুন আপনার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পাঠানো চিঠি মোতাবেক যে জবাব ও ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়, তা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ায় মেডিকেল প্র্যাকটিস এবং প্রাইভেট ক্লিনিক এবং ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী আপনার হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো।
আইন বলছে, উক্ত অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে পুরো ঘটনাটি নিয়ে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ বিব্রত উল্লেখ করে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের এইচ আর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স তারিকুল ইসলাম মুকুল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ৬ নবজাতকের মৃত্যুর মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় আমরা খুবই মর্মাহত। লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে আমাদের অবস্থান শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাদের জানানো হবে। তবে এর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক নবজাতকের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে প্রদানসহ স্বজনদের চাকরি, সারাজীবন বিনা মূল্যে সেবার ঘোষণা দেয়।

