ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

পদ্মার পেটে কৃষকের শেষ সম্বল

ফয়সাল আহমেদ, রাজবাড়ী
প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নে হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন। বর্ষা মৌসুম আসার অনেক আগেই নদীর এই রাক্ষুসী মূর্তিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদীতীরবর্তী মানুষ। গত কয়েক দিনে কয়েকশ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে ঘরবাড়ি ও শেষ সম্বল হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে মুন্সিবাজার এলাকার শতাধিক পরিবার।

দেবগ্রাম ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নদীতীরবর্তী এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভাঙনের এক করুণ দৃশ্য। প্রায় ৫০ ফুট এলাকাজুড়ে নদীর পাড় ধসে পড়েছে। নদী যত জনপদের দিকে এগোচ্ছে, ততই ছোট হয়ে আসছে কৃষকের ফসলি মাঠ। কয়েক দিনের ব্যবধানে ধান, পেঁয়াজখেতসহ বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হাবিজল সরদার বলেন, ‘আমার তিন বিঘা জমির ধান চোখের সামনে নদী গিলে খেল, কিছুই করতে পারলাম না।’

এদিকে ভাঙনের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ফুটে ওঠে স্থানীয় কৃষক জুলহাস সরদারের কথায়। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান, একসময় তাদের পরিবারের ১০০ বিঘা জমি ছিল। কিন্তু পদ্মার ধারাবাহিক ভাঙনে আজ ছয় ভাইয়ের ভাগে মাত্র ছয় বিঘা জমি অবশিষ্ট রয়েছে। জুলহাস সরদারের আশঙ্কা, এই সামান্য জমিটুকু চলে গেলে তাদের জীবিকা নির্বাহের আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। এমন অনিশ্চয়তা এখন ওই এলাকার প্রতিটি ঘরে।

এ বিষয়ে দেবগ্রাম ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. লাল মিয়া বলেন, ‘আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। গত কয়েক দিনের ভাঙনে যেভাবে ফসলি জমি নদীতে যাচ্ছে, তাতে কয়েকশ পরিবার গৃহহীন হওয়ার পথে। আমি ব্যক্তিগতভাবে উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) বারবার অনুরোধ করেছি। এখনই জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন না থামালে আমাদের এই ইউনিয়নের অস্তিত্ব মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা স্থায়ী বাঁধ চাই।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করলেই কেবল প্রশাসনের টনক নড়ে। তখন তড়িঘড়ি করে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক হানিফ শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে এই এলাকায় ভাঙন চললেও কোনো স্থায়ী বাঁধ আমরা পেলাম না। সাময়িক পদক্ষেপ দিয়ে এই বিশাল ক্ষতি রোধ করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও প্রশাসনিক আশ্বাসের কোনো সুফল না মেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের ভাঙনে ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে বেথুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থানীয় কবরস্থান, ঈদগাহ এবং অসংখ্য বসতবাড়ি। ভাঙন যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় বিলীন হতে পারে এসব স্থাপনা। ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমাতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে তাদের অপরিপক্ব কাঁচা পাট কেটে নিচ্ছেন, যাতে অন্তত ঘর থেকে খরচ হওয়া মূলধনটুকু বাঁচানো যায়।

এদিকে দৌলতদিয়া ঘাট আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ছয় কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের একটি বড় পরিকল্পনা থাকলেও গত সাত বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতাই বর্তমান সংকটের মূল কারণ বলে মনে করছে স্থানীয় সচেতন মহল। প্রশাসনের উদাসীনতায় গোয়ালন্দ উপজেলার মানচিত্র থেকে একের পর এক এলাকা হারিয়ে যাচ্ছে। জনবসতি রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপ এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, ‘আমরা ভাঙনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাউবোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে, রাজবাড়ী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাজমিনুর রহমান জানান, একটি কারিগরি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় দ্রুত জিও ব্যাগসহ অন্যান্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।