× UCB Sticker Card
শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৫:২১ এএম

‘সবার জন্য’ বাজেট

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৫:২১ এএম

‘সবার জন্য’ বাজেট

সীমিত সম্পদের মধ্যে ‘সব মানুষকে’ আগামী অর্থবছরের বাজেটের আওতায় আনার কথা বলেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সবার জন্য এই বাজেট। সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে দেশের প্রতিটি মানুষকে বাজেটের আওতায় আনা হয়েছে। এ জন্য দেশকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে থ্রিআর কৌশলে এগোচ্ছে বর্তমান সরকার। থ্রিআর হলোÑ রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন। অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবর্তে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি নতুন গতি ফিরে পাবে বলে আশা অর্থমন্ত্রীর। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবার জন্য ‘ইনক্লুসিভ’ বাজেট করতে হয়েছে। গত দেড় দশক আমাদের অর্থনীতি ছিল পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। কিছু মানুষের অর্থনীতি। নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে, একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের অর্থনীতির ভাবনায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই। সেই ভাবনা থেকে সীমিত সম্পদের মধ্যে সবার জন্যই এই বাজেট দেওয়া হয়েছে।

এবারের বাজেটের ভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই বাজেটের প্রেক্ষাপটটা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। দীর্ঘ এক ফ্যাসিবাদী শাসনের পর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং এরপর নির্বাচিত সরকারের এই সময়টাতে জনগণ বাজেটের আসল কার্যকারিতা ফিরে পেয়েছে। বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে দেশবাসী এমন একটি বাজেট মিস করেছে, যা সত্যিকার অর্থে জনগণের চিন্তার প্রতিফলন ঘটায়। বাজেট বলতে মূলত আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনকেই বুঝি।’ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, বাজেট প্রণয়নে সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতিকে আরও গণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। অতীতে অর্থনীতি কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের জন্যও সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। সীমিত সম্পদের মধ্যেও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ, কর্মসূচি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বাজেট শুধু নীতিমালা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ‘রোডম্যাপ’ বা রূপরেখাও বাজেটে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘গত দেড় দশকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ব এখন নিয়মভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ক্রমশ সুরক্ষাবাদী (প্রটেকশনিস্ট) ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট ও দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। দেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই কম মজুরি পান। কারণ তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো এমন জনশক্তি তৈরি করা, যারা দেশে কিংবা বিদেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন এবং বেশি আয় করতে সক্ষম হবেন। একই সঙ্গে সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে সরকার কোনো নতুন মেগাপ্রকল্প হাতে নেয়নি। বরং সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু অভিযোজন এবং দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতির সব স্তরের মানুষ যাতে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে, সে লক্ষ্যেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকার একটি ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি করতে চায়। ধারাবাহিকভাবে সংস্কার ও বিনিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি দৃশ্যমানভাবে ঘুরে দাঁড়াবে।

এরপর সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রশ্ন আহ্বান করে তিনি বলেন, আমরা আসছি কিন্তু আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। যে কারণে আমরা বিশ্বাস করি যে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে জবাবদিহি। জনসাধারণের কাছে জবাবদিহি করা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে। পণ্যের উৎস থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি, খাদ্য ও সারসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অন্তত তিন মাসের মজুত এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তিনি বলেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বা স্পট ক্রয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যেখানে মূল্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত গুদাম ও সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা গেলে ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি কমানো গেলে ব্যবসার খরচও কমবে। সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি কমাতে ভূমিকা রাখবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, মানুষের অভাব থাকলে দুর্নীতির দিকে ঝোঁকার একটি প্রবণতা তৈরি হয়, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো প্রায় ১১ বছর ধরে সমন্বয় করা হয়নি। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিষয়টি সমন্বয় করা প্রয়োজন। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন বৃদ্ধি পায়, ফলে দুই খাতের মধ্যে একটি বৈষম্য তৈরি হয়।

আমির খসরু বলেন, ঢাকার বাইরে প্রায় ১৬০ একর জায়গাজুড়ে একটি বড় ক্রিয়েটিভ সেন্টার তৈরির কাজ নেওয়া হচ্ছে। সেখানে থিয়েটার, বিনোদন, ডিজাইনার শপ, চারুকলা, শিল্পীদের প্রদর্শনীসহ নানা ধরনের আয়োজন থাকবে। একজন মানুষ যেন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো সময়টুকু সেখানে কাটাতে পারেনÑ সেই ধারণা থেকে পরিকল্পনাটি নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকা-কে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে হলে সেগুলোকে আয়মুখী করতে হবে। যারা সৃজনশীল কাজ করবেন, তাদেরও আয় হতে হবে এবং মানুষও বিনোদনের সুযোগ পাবে। এ কারণে সরকার ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে মনিটাইজ করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংগীত, লোকসংস্কৃতি ও লালন ধারার মতো বহু সম্পদ থাকলেও সেগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। অথচ বিশ্বের অনেক দেশ সংগীত, চলচ্চিত্র ও থিয়েটারকে সফলভাবে অর্থনীতির অংশে পরিণত করেছে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অংশ হিসেবে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু করছে। দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ও ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্র, হেরিটেজ সাইট এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থান সংরক্ষণ ও উন্নয়নে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; স্বাস্থ্যমন্ত্রী শাখাওয়াত হোসেন বকুল; তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন; মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী আমিনুর রশিদ; শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন; পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি; প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহদী আমিন; প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণি; মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গণি; বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান; অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান প্রমুখ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকট ও হরমুজ প্রণালির জটিলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার মধ্যেও দেশের তেল সরবরাহ চেইন স্থিতিশীল ছিল এবং বর্তমানে কোনো ধরনের ঘাটতি নেই। টুকু বলেন, গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর সংকটের পর কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে থাকা কিছু জিটুজি চুক্তিতে ফোর্স মেজর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে নির্ধারিত উৎস থেকে সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হলেও সরকার দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ নিশ্চিত করেছে।

মন্ত্রী জানান, এ সময় সরকার প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের তেল ক্রয় করে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বিশ্বের অনেক দেশে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলেও বাংলাদেশে কোনো ধরনের ড্রাই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত ছিল।

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বকেয়া ও আর্থিক ঘাটতি ছিল। আইপিপি (ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা হলেও তা ভোক্তাদের কাছে কম দামে সরবরাহ করার কারণে একটি বড় আর্থিক গ্যাপ তৈরি হয়েছে, যা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। মন্ত্রী জানান, বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে, যা ধীরে ধীরে পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে বাপেক্সকে পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে এবং সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যাতে সমুদ্রের ব্লকগুলোতে যৌথভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো যায়। মন্ত্রী বলেন, সমুদ্র বিজয়ের পরও বাংলাদেশ প্রত্যাশিত হারে গ্যাস অনুসন্ধানে এগোতে পারেনি। অন্যদিকে যেসব দেশ সমুদ্রসীমা অর্জন করেছে, তারা সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলন করে রফতানি পর্যন্ত করছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ক্যাপাসিটি চার্জ ইস্যুর প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকার এই বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলোÑ অনেক বিনিয়োগকারী জানিয়েছেন, ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করলে তাদের পক্ষে ব্যাংকঋণ ও আর্থিক দায় সামলিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায় হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলে দেশে আবার বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হতে পারে, তাই বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য তারল্য সংকট নেই। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে প্রথমে স্থিতিশীল করতে হচ্ছে, কারণ অতীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। বিশেষ করে আলোচিত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক আগে থেকেই সমস্যাগ্রস্ত ছিল। আগের সরকারের প্রণীত বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় বর্তমানে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। মোস্তাকুর রহমান বলেন, আমাদের জানামতে ওই পাঁচটি ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংকগুলোতে তেমন কোনো তারল্য সংকট নেই। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গভর্নর বলেন, ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে সরকারের সক্ষমতা ও ন্যায়বিচারের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

ঋণখেলাপি বা নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। সুদের হার বৃদ্ধি, কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিলম্বের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে সময় লেগেছে। তবে সব ক্ষেত্রকে একইভাবে ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথম দিন থেকেই বিষয়টি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। এ জন্য একটি ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ কাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করতে ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি সম্পদ ফ্রিজ করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অর্থ পুনরুদ্ধারও সম্ভব হয়েছে।

গভর্নর জানান, আন্তর্জাতিকভাবে চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের গড় হার ২ শতাংশেরও কম এবং এ প্রক্রিয়ায় ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবুও সরকার এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী ১ জুলাই থেকে দেশকে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু হবে। এ লক্ষ্যে ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ফলে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠানের লেনদেনেও কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট-ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়বে এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাজেটে কালো টাকা প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো প্রভিশন রাখা হয় নাই। আমার মনে হয়, আপনাদের মধ্যে একটু ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ছোট্ট একটা প্রভিশন গত বছরই করেছিলাম, যারা জমি বিক্রি করেন, যে টাকা পান, কিন্তু রেজিস্ট্রেশন হয় কম দামে। অথচ ওনার টাকাটা কিন্তু হোয়াইট, উনি জমি বিক্রি করেছেন ৫ কোটি টাকায়, রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ১ কোটি টাকায়। বাকি ৪ কোটি টাকা নিয়ে উনি খুব বিপদগ্রস্ত থাকেন। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা গত বছরেই একটা সুযোগ করেছিলাম যে, উনি যদি বাকি ৪ কোটি টাকা প্রমাণ করতে পারেন যে ওনার ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন হয়েছে এবং ওনার যদি বায়নানামা থাকে, যদি প্রুভ করতে পারেন, তাহলে উনি ওটার ওপরে রেগুলার ট্যাক্স এবং ১৫% গেইন ট্যাক্স, সেই হারে ট্যাক্স দিয়ে এটা দেখাতে পারবেন। আব্দুর রহমান বলেন, এটা আমরা গতবারই করেছি, এটা ছিল সেলারের দিক থেকে। এবার বায়ারের জন্যও একই রকম একটা সুবিধা চিন্তা করা হয়েছিল যে, বায়াররাও ঝামেলায় পড়েন যে একটা ফ্ল্যাট উনি কিনলেন ২০ কোটি টাকা দিয়ে, কিন্তু রেজিস্ট্রেশন হলো ৩ কোটি টাকায়।

তিনি বলেন, আমাদের ট্যাক্সের লোকজন ওনাকে গিয়ে আবার চেইজ করে যে, আমাদের কাছে প্রমাণ আছে আপনি ২০ কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন, আপনার এখন এটার ওপরে এক্সট্রা ট্যাক্স দিতে হবে জরিমানাসহ। তারাও বিরাট বড় একটা ঝামেলায় পড়ে যায়। তাদের ‘একটু রিলিফ দেওয়ার জন্য’ এবার বাজেটে নতুন বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, যদি ওনারা নিজেদের থেকে ডিক্লেয়ার করেন, যাতে করে উনি ২০% এক্সট্রা দিয়ে, রেগুলার ট্যাক্সের প্লাস ১৫% এক্সট্রা দিয়ে, যাতে এটা দেখাতে পারেন। আর যাদের নিজের টাকা আছে অলরেডি, যার ট্যাক্স দেওয়ার টাকা আছে, হোয়াইট মানি আছে, তাকে কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না। এ রকম একটা প্রভিশন আছে, তবে এটা নিয়ে যদি আপত্তি থাকে, আমার মনে হয় স্যাররা এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করবেন। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এই যে মৌজা রেটের বিষয়টা, যে সত্যিকার ভ্যালু থেকে অনেক কম থাকে সেটা আপনারা সবাই জানেন। এটার ওপর আমরা কাজ করছি, যেহেতু আমরা সময় পাই নাই, দেড় মাসের মধ্যে বাজেট করতে হয়েছে, অনেক কিছু ইচ্ছা থাকলেও আমরা শেষ করতে পারিনি। মন্ত্রী আরও বলেন, মৌজা রেটের যে বিষয়টা আছে, সেটার ওপর একটা কমিটি হয়েছে এবং মৌজা রেটগুলো আমরা রিভিউ করতে যাচ্ছি। আমরা মৌজা রেটগুলো একটা রিয়েল ভ্যালুতে আনার চেষ্টা করছি, যাতে করে ওই কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে আর কোনো সুযোগ থাকবে না। তিনি বলেন, এটা দীর্ঘ একটা কাজ। এখানে কিন্তু সারা বাংলাদেশের একটা সার্ভে করতে হবে, মৌজাভিত্তিক করতে হবে। এখানে একটা মৌজার বাজারের এক মূল্য, তারপরে ধানের একেবারে চাষবাসের জায়গার আরেকটা মূল্য। এই সার্ভেটা আমরা করতে যাচ্ছি এবং এটা কমপ্লিট হলে মৌজা রেটটা যখন মার্কেট রেটের সঙ্গে আমরা নিয়ে আসতে পারব, তখন কালো টাকা সাদা করার খুব বেশি সুযোগ থাকবে না।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!