প্রশ্ন ছিল হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে দানের কোটি টাকা যায় কোথায়? ব্যয় হয় কোন কোন খাতে এবং কীভাবে? জবাব মেলেনি। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও মাজার পরিচালনাকারীরা বিষয়টি কখনোই খোলাসা করেননি, বরং সব সময় তা চেপে রেখেছেন। কিন্তু এবার সেই সুযোগ আর থাকছে না। সিলেটের জেলা প্রশাসনই ওই অর্থ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে।
প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত, এমনকি বিদেশ থেকেও হাজার হাজার ভক্ত ও আশেকান ছুটে আসেন দুই মাজারে। ভক্তি, বিশ্বাস আর মানতের জায়গা থেকে প্রতিদিন এ দুই মাজারে জমা পড়ে বিপুল পরিমাণ নজরানা। নগদ টাকা তো আছেই, এর পাশাপাশি ভক্তরা মুক্তহস্তে দান করেন স্বর্ণালংকার, গবাদি পশু, চাল-ডালসহ হরেক খাদ্যসামগ্রী। প্রতিদিনের এই দানের আনুমানিক বাজারমূল্য লাখ লাখ টাকা, যা মাসে ও বছরে কোটি কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আসলে যায় কোথায়? কার পকেটে ঢুকছে ভক্তদের দেওয়া এই নজরানা? কেন যুগের পর যুগ ধরে এই বিশাল তহবিলের কোনো সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য হিসাব নেই? গত বুধবার সিলেট জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক জরুরি উচ্চপর্যায়ের সভায় এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এ নিয়ে সিলেটে চলছে তোলপাড়।
মাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, প্রতিদিন এ দুই মাজারে যে পরিমাণ নগদ টাকা ও অন্যান্য সামগ্রী দান করা হয়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কখনোই জনসম্মুখে আনা হয়নি। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে যেমনÑ বার্ষিক ওরস মোবারক, প্রতি জুমাবারের রাত, শবেবরাত কিংবা সরকারি ছুটির দিনগুলোতে সাধারণ দিনের তুলনায় দানের পরিমাণ ও ভক্তদের সমাগম কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
মাজারের এই বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য ও এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রথম জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয় ২০০৩ সালে। সেবার শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের ঐতিহ্যবাহী ও শতবর্ষী গজার মাছের মৃত্যুর ঘটনাটি দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তখন তীব্র সমালোচনার মুখে মাজার কর্তৃপক্ষ একটি সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হন। সেই সংবাদ সম্মেলনে মাজার কর্তৃপক্ষ জানান, মাজারে দানের অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারীদের (খাদেম ও মুতাওয়াল্লি) ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ভরণপোষণ এবং জীবনযাত্রায় ব্যয় হয়। অবশিষ্ট অর্থ মাজারের দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ, আলোকসজ্জা, লঙ্গরখানা ও উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনের সেই মৌখিক বক্তব্যের পর আজ পর্যন্ত মাজারের ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত ও দালিলিক তথ্য জনসম্মুখে উপস্থাপন করা হয়নি। এতে মাজারের ভেতরের আর্থিক লেনদেন পদ্ধতি সাধারণ মানুষের কাছে সব সময়ই কুয়াশাচ্ছন্ন রয়ে গেছে এবং স্থানীয়দের মনে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও গভীর কৌতূহল জমে আছে।
সূত্র জানায়, মাজারের অর্থ বণ্টন ও মালিকানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত ও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হলো এর ঐতিহ্যবাহী ‘বাড়ি’ বা ‘পালা’ প্রথা। মাজারে বংশানুক্রমিক যে খাদেম পরিবারগুলো রয়েছে, তাদের মধ্যে দিন, সপ্তাহ বা মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় ভাগ করে দেওয়া থাকে। এই সময়সীমাকে স্থানীয় মাজারের ভাষায় ‘বাড়ি’ বা ‘পালা’ বলা হয়। যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘বাড়ি’ চলে, তখন মাজারের দান-সিন্দুক খোলা, নজরানা ও দানসামগ্রী সংগ্রহ এবং সামগ্রিক দেখভালের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে সেই বাড়ির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের হাতে। যেদিন ‘বাড়ি’ হয়, সেদিন সেই পরিবারে থাকে উৎসবের আমেজ। ব্যাপক খানাপিনা ও আনন্দ-আয়োজন করা হয়।
সূত্রমতে, অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী, ওই নির্দিষ্ট ‘বাড়ি’র সময়কালে মাজারে যে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার কিংবা গবাদি পশু দান হিসেবে আসে, তার একটি বড় অংশ সেই বাড়ির দায়িত্বে থাকা নির্দিষ্ট বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারী ও খাদেম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়।
যেহেতু কোনো ডিজিটাল বা লিখিত হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয় না, তাই প্রতি ‘বাড়ি’তে ঠিক কত টাকা আদায় হয়, তার সুনির্দিষ্ট অঙ্কও কেউ জানেন না। তবে স্থানীয় অনেকের ধারণা, সাধারণ সময়ে প্রতি সপ্তাহের একটি ‘বাড়ি’ থেকে সংগৃহীত নজরানার আর্থিক মূল্য কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর ওরসের মতো বড় উৎসবের সময় একেকটি ‘বাড়ি’র আয় কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এই নিয়মের কারণে মাজারের এই বিশাল আয়কে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র মতো ব্যবহার করার একটি অলিখিত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
অবশেষে মাজারের এই হিসাবহীনতার সংস্কৃতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। গত বুধবার সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে একটি নজিরবিহীন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেনÑ সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিদল, ওয়াক্ফ এস্টেটের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি এবং মাজার ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক ব্যক্তিরা।
সভায় দরগাহ দুটির বর্তমান আয়-ব্যয়, দান-অনুদান, প্রশাসনিক কাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে চুলচেরা ও বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় উপস্থিত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিভিন্ন কমিটির পক্ষ থেকে যখন আর্থিক রেকর্ড ও নির্ভরযোগ্য হিসাবপত্র উপস্থাপনের কথা বলা হয়, তখন সেখানে ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে আলোচনায় উঠে আসে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য হিসাব চাওয়া হলে তারা স্পষ্ট বা সুসংগঠিত হিসাব উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। তাদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়ার মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ রেকর্ডই ছিল না। সভায় বক্তারা অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহ কেবল দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সমগ্র সিলেটবাসীর আবেগ, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গৌরবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই দরগাহগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ব্যবসার জায়গা হতে পারে না; বরং এটি সমগ্র সিলেটবাসীর যৌথ সম্পদ। ফলে এর আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় মাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং প্রশাসনের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় রেখে পরিচালনা এখন বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
মাজার কর্তৃপক্ষের এই চরম অব্যবস্থাপনা ও হিসাবের খামতি দেখে সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, ‘আয়-ব্যয়ের মধ্যে কোনো স্বচ্ছতাও নেই। ওদের কাছে কোনো হিসাব নেই।’
এই চরম অনিয়ম ও হিসাবহীনতার অবসান ঘটাতে জেলা প্রশাসক একটি ঐতিহাসিক ও কঠোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও সমন্বয়ে ওয়াক্ফ এস্টেট এবং মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে প্রতিদিনের হিসাব সংরক্ষণ করবে। এই এক মাসের কঠোর পর্যবেক্ষণকালীন মাজারের প্রতিদিনের আয়ের সঠিক ও বাস্তব চিত্র কী, দানের মূল উৎসগুলো কী কী, ব্যয়ের খাতগুলো কোথায় কোথায় যায় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার গলদগুলো কোথায়Ñ এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা ও অডিট করা হবে। এ ছাড়া সভায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিনিধি মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা, একটি নির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী নীতিমালার আওতায় মাজার পরিচালনা করা এবং নিয়মিত এক্সটার্নাল অডিট করার পক্ষে জোরালো মতামত দেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন